Research Article Open Access

নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা ও বাংলাদেশের সিনেমায় সম্ভাবনা

Rudra Kawser 1 July 2026
নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা ও বাংলাদেশের সিনেমায় সম্ভাবনা

Synopsis

‘নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা ও বাংলাদেশের সিনেমার সম্ভাবনা’ প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে নিরীক্ষামূলক সিনেমার পটভূমি, এর শৈলী ও প্রকরণ, কিভাবে আভা-গার্দ সিনেমা থেকে নিরীক্ষামূলক সিনেমা আলাদা হয়ে উঠছে এবং বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এর প্রভাব। এ পর্বে আরও আলোচিত হয়েছে ভারতের সাংষ্কৃতিক, ভৌগলিক, ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য মিলে প্রাচ্য দর্শন গড়ে উঠেছে এবং এ দর্শন কিভাবে ভারতীয় নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রে প্রভাব ফেলেছে। বাংলা নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের প্রাথমিক সূত্র পাওয়া যায় ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমায় এবং লক্ষ্য করা যায় ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমায় তার পূর্ণ বিকাশ। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সিনেমা নানা প্রতিবন্ধকতার পথ পার হয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষাগত নতুনত্ব তৈরী করতে উল্লেখ করার মতো কোন উদাহরণ রাখেনি। এরূপ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সিনেমায় নিরীক্ষার প্রয়োগ নতুন সিনেমা ভাষা তৈরীতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। মূলশব্দ (Keywords) নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র, আভাঁ গার্দ, মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব, সুররিয়ালিজম, প্রাচ্য দর্শন, সিনেমা প্রায়োগা

প্রথম অধ্যায়

ভূমিকা

 

Experimentation is an ever-living and never dying thing.

                                                        - ঋত্বিক ঘটক

 

সিনেমা এমন একটি শিল্প আঙ্গিক যার যাত্রা শুরু হয়েছে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে। শিল্প যেহেতু ‘সময়জাত’ তাই সময়ের (কাল) প্রভাব এর মধ্যে প্রকট। সময় বা কালগত পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মননে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংষ্কৃতিক জীবনে যে পরিবর্তন লক্ষিত হয়, সেই পরিবর্তন শিল্পীর জীবন দর্শনের মধ্য দিয়ে শিল্পে উঠে আসে। শিল্পের নানা মাধ্যমে- পেইন্টিং, সাহিত্য-কবিতায় বিভিন্ন সময় বা কালগত পরিবর্তন নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্ম দিয়েছে। অপেক্ষাকৃত তরুণ শিল্প মাধ্যম সিনেমা যদিও তার একশ বছরেরও বেশি যাত্রা পথ অতিক্রম করেছে এবং হয়ে উঠেছে শক্তিশালী এক গণমাধ্যম।

সেই সিনেমার জন্ম বৈজ্ঞানিক নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষার হাত ধরে। গতিময় ছবির বিষ্ময় কাটিয়ে ভিজ্যুয়াল ল্যাংগুয়েজে শিল্পী এবং দর্শক উভয়ই যখন শিক্ষিত হয়ে উঠলো, তখন প্রতিনিয়তই বদল হতে শুরু করলো সিনেমা ও তার গতিপথ। একটা শিল্প জন্ম নেবার পর থেকেই ক্রমাগত তার পরিবর্তন হতে থাকে। এক যুগ থেকে আর এক যুগের সময়ে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই বিভিন্ন শিল্পীরা শিল্পের শরীরে নতুন নতুন প্রয়োগ করতে থাকেন। বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রকরণ শৈলীতেও একটা পরিবর্তন সূচিত হয়। সিনেমার ক্ষেত্রেও এ ব্যাপারটা তার জন্মলগ্ন থেকেই দেখা যাচ্ছে। ঋত্বিক ঘটক যাকে ‘ever-living and never dying thing’ বলছেন।

 

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের পটভূমি

 

 

শিল্প-সাহিত্য-চিত্রকলায় যেসকল শিল্প আন্দোলন হয়েছে নানা সময়ে, যেমন- পরাবাস্তববাদ, দাদাবাদ, কিউবিজম, কনস্ট্রাক্টিভিজম, অভিব্যক্তিবাদ, ফিউচারিজম- এগুলো সিনেমাকে প্রভাবিত ও বিকশিত করেছে। ১৮৯৬ সালে ফ্রয়েডের মনঃ সমীক্ষণ তত্ব আবিষ্কারের পর সুররিয়ালিজমদাদাইজম উনিশ শতকের শেষে এসে বিকাশ লাভ করে এবং বিশ শতকের শুরুতে সিনেমা ল্যাংগুয়েজকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। ফলে সিনেমায় শুরু হয় এক্সপেরিমেন্টেশন বা নিরীক্ষাধর্মীতা। যা কিছু চলতি শিল্পরীতি ও ঐতিহ্যকে অনুসরণ না করে নতুন নতুন শিল্পসৃষ্টিতে উদ্যমী হয়ে ওঠে তাই নিরীক্ষামূলক শিল্প।

সিনেমার যে প্রচলিত রীতিনীতি তাকে পুনঃ পুনঃ মূল্যায়ন করে, নিরীক্ষা করে এবং এর মাধ্যমে প্রচলিত আঙ্গিককে ভেঙ্গে নতুন আঙ্গিক প্রদানের চেষ্টা করে তাই মূলত নিরীক্ষামূলক সিনেমা। বিশ শতকের শুরুতে সিনেমার ইতিহাসে আভাঁ-গার্দ নামে আর এক ধরণের সিনেমা চর্চা শুরু হয়। অনেকেই মনে করেন- নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা ও আভাঁ-গার্দ একই, এর কারণ অবশ্য দুটোই শৈলী এবং কোনটিই সিনেমা মুভমেন্ট নয়।

আভাঁ-গার্দ শৈলীর, সাবজেক্ট ম্যাটারের ও আঙ্গিকের সম্পূর্ণ নতুন Innovationঅপরদিকে নিরীক্ষামূলক সিনেমা হচ্ছে এই যে নতুন আঙ্গিক উদ্ভাবিত হচ্ছে সেগুলোর practiceএবং এই practice এর মধ্য দিয়ে পুনরায় নতুন শৈলী বা আঙ্গিকে পৌঁছানো। যেকোন শিল্পেই শিল্পী যেহেতু তার নিজস্ব ‘কাল’ বা সময়কে ধারণ করতে চায় ফলে নতুন ফর্ম তৈরী হয়। কেননা, শিল্পী দেশ, কাল সর্বোপরি শিল্পীর নিজস্ব শিল্প দর্শন এই নতুন নতুন নিরীক্ষার জন্ম দেয়। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মতো সিনেমার ক্ষেত্রেও এই যে নতুন আঙ্গিক দেওয়ার প্রচেষ্টা তা যুগে যুগে সিনেমার বিভিন্ন আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে। অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ের সিনেমা আন্দোলনগুলো এই নিরীক্ষামূলক সিনেমা থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছে।

চলচ্চিত্রে ১৯২০ সালের দিকেই আভাঁ-গার্দ শিল্পভাবনা প্রভাব বিস্তার করে। এই সময় কয়েকজন ফরাসি চলচ্চিত্র তাত্বিক Louis Delluc, Germaine Dulac, Jean Epstein প্রমুখ আভাঁ-গার্দ চলচ্চিত্র নির্মানে নিয়োজিত হন।

তাদের চলচ্চিত্রে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য বিস্তার করে সেগুলো হচ্ছেঃ হাই ও পপুলার আর্ট, বাস্তববাদী বনাম স্বাভাবিকতাবাদী চলচ্চিত্র, দর্শকের সাথে স্ক্রিনের সম্পর্ক, সম্পাদনার শৈলী, বিশেষ করে মন্তাজতত্ব, একই সময়ে ঘটেছে এমনসব ঘটনার উপস্থাপন, মনঃকল্পিত বিষয়সমূহ, নির্জ্ঞানস্তরের কর্মকান্ড, চলচ্চিত্রে সাইকোএনালিটিক্যাল সম্ভাবনা, অত্যুর চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রে সংগুপ্ত ছন্দ ও চিহ্নের মাত্রা সন্ধান প্রতিভূ। এদের প্রায় সব রচনাই নিরীক্ষাধর্মী।

 

Susan Hayward এর বিবেচনায় তিনটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে আভাঁ-গার্দ চলচ্চিত্র প্রচেষ্টা সক্রিয় ছিলঃ

-      চলচ্চিত্রের প্রকার নিরূপণ

-      চলচ্চিত্র ভাষার স্বরূপ সন্ধান

-      আত্মমাত্রিকতার সূত্র নির্ধারণ

এছাড়া Susan Hayward এর মতে আভাঁ-গার্দিয় চলচ্চিত্রধারা তিনটি পর্যায় অতিক্রম করেছেঃ

এক। সাবজেক্টিভ চলচ্চিত্রের পর্যায় – এই পর্যায়ে চরিত্রের অন্তরস্থ ভাবনা চিত্রায়িত করা হয়েছে। যেমনঃ Germaine Dulac এর La Souriante Mme Beudet (১৯২৩)।

দুই। পিউর চলচ্চিত্র পর্যায় – এই পর্যায়ে চলচ্চিত্র তার প্লাস্টিক আর্টের বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। যেমনঃ Rene Clair এর Entr’acte (১৯২৪)।

তিন। সুররিয়ালিস্ট চলচ্চিত্রের পর্যায় – এই পর্যায়ে প্রথম দুটি পর্যায়ের সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায় এবং একই সাথে স্বপ্ন ও অচেতন মনের যৌক্তিক ও অযৌক্তিক আচরণের চলচ্চৈত্রিক উপস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। যেমনঃ Luis Bunuel এর Un Chien Andalou (১৯২৯)।

আভাঁ-গার্দ চলচ্চিত্রধারায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বুদ্ধিবৃত্তির প্রভাব লক্ষনীয়। ফ্রান্সেই এই বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস ঘটে ফ্যাসিবাদ বিরোধিতা, বুর্জোয়া দর্শনকে সমালোচনার সামনে দাঁড় করানো, এমনকি সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা যা শ্রমিকশ্রেণীর তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। কবিতা, নাটক, উপন্যাস, চিত্রকলা- সব কলারূপেই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে দেখা যায়। চলচ্চিত্রেও নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরু এবং পরিণতি অর্জন করে লুই বুনুয়েল এসে। বুনুয়েল তার চলচ্চিত্রে সুররিয়ালিজম এর শৈল্পিক প্রকাশ ঘটান। শুধু বুনুয়েল নয়, এই ধারায় জ্যঁ রেনোয়া, জ্যঁ ককতো, আবেল গাঁস প্রমুখ বিশেষ অবদান রাখেন।

আভাঁ-গার্দ গত শতাব্দীর বিশের দশকে ফরাসি ও জার্মান চলচ্চিত্র-রচয়িতাদের কাছে একটা শৈলী হয়ে উঠেছিলো। এই শৈলী বা স্টাইল সম্পর্কে ধীমান দাশগুপ্ত বলছেন-

ক্লেয়ার, দুলাক, দেলুক, এপস্তাঁ ও রেনোয়া প্রবর্তিত এই স্টাইলে অন্তরঙ্গ বিষয় ...... যার অনবদ্য উদাহরণ ১৯৫৭ নাগাদ সূচিত ফ্রান্সের নিউ ওয়েভ বা নতুন রীতির চলচ্চিত্র।

 

অর্থাৎ ১৯২০ থেকে ১৯২৫ পর্যন্ত দেলুক, কানুদো, মুসিনাক, রেনে ক্লেয়ার এবং রোবেয়ার দেসনো প্রমুখেরা সিনেমায় শিল্প সম্ভাবনার প্রতি মননশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। তারা এটা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যে চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাময় যা কিছু উপকরণ, এর ব্যকরণ, নন্দনতত্ব, সবকিছুকে দুঃসাহসিকতায় ব্যবহার করতে হবে যা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতি ও পর্যবেক্ষণকে প্রকাশ করতে পারে। এই পর্যায়ে সমসাময়িকভাবে কিছু সংখ্যক নবীন চলচ্চিত্রকারেরা দৃষ্টিগ্রাহ্য চিত্রকল্পকে কাব্যিক উপকরণের মাধ্যমে গ্রহণ করতে উৎসাহী হলেন। তারা বললেন, সিনেমা হলো কবিতার মতো মর্মগ্রাহী, বাস্তবতা এবং নীতিবাদের মধ্যবর্তী সংযোজক ভাঙতে হবে। ডকুমেন্টরি ও কাহিনীমূলক বর্ণনার রীতি ও পারষ্পরিক সম্পর্ক উপলব্ধি করতে হবে। সনাতন রীতি কাহিনী বলা চলবেনা।

ত্রিশের দশকের আভাঁ-গার্দঃ

·         জিগা ভের্তভ – Man with a movie camera (১৯২৯)

·         বুনুয়েল – L’age d’or / Age of gold (১৯৩০)

·         ককতো – The blood of a poet (১৯৩২)

·         জোসেফ কর্নেল – Rose Hobart (১৯৩৬)

অর্থাৎ বলা যায় যে –

Experimental film or avant-garde cinema is a mode of filmmaking that rigorously re-evaluates cinematic conventions and explores non-narrative forms and alternative to traditional narrative methods of working.

আরও প্রসঙ্গত-

The aim of experimental filmmaking is usually to render the personal vision of an artist or to promote interest in the new technology rather than to entertain or to generate revenue, as is the case with commercial films.

যখন আভাঁ-গার্দ কোন একটি শিল্প আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এগোয়, যেমনঃ কিউবিজম, তখন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই গতিবিধি সমালোচনার গ্রহণযোগ্যতার উপরে থাকে। কিন্তু কিউবিজম যখন মূলধারার ঐতিহ্যের সাথে মিশে যায়, তখন আর উক্ত গতিবিধি আভাঁ-গার্দ থাকে না। সিনেমার ক্ষেত্রে আভাঁ-গার্দ কখনোই বিকাশমান চলচ্চিত্র ধারার অগ্রপথিক নয়, বরং বাণিজ্যিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কেননা সাধারণ শিল্পমান সম্পন্ন সিনেমা সমূহ দিয়েই বিকাশমান চলচ্চিত্র ধারা গঠিত হয়। আভা-গার্দ এসবের থেকেও আরও বিচ্ছিন্ন এবং এককভাবে নতুন পথের পথিক।

এই যে নতুনত্ব তৈরীর প্রবনতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তা সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটক বলছেন-

এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে ফিল্ম ফর্মটির অবকাশ বাড়িয়ে নতুন আয়তনের পরিধিতিতে ব্যপ্ত করে দেয়ার প্রচেষ্টা। স্থান ও কালের সম্পর্কে এ প্রচেষ্টা নিরীক্ষার পর্যায়ে উন্নীত হয়। ...শিল্পগত নিরীক্ষা আলাদা জিনিস। তা হচ্ছে নব-সম্পর্কের সন্ধান ও প্রকাশ। বক্তব্য সব শিল্পেরই ধ্যানের বস্তু। সে বস্তুর সন্ধান ও অনুধাবন দর্শনের অঙ্গীভূত। শুধু যে বস্তু যে সব নব সম্পর্কের মধ্যে প্রতিভাত, যে সব নবরসে প্রকাশিত, তার সার্থক চিন্তার উদ্দীপনই তো শিল্পের এক্সপেরিমেন্ট। ...এক্সপেরিমেন্ট মানে চেনাজানা পথ ছেড়ে অজ্ঞাত বিপদসংকুল দিকে এগোনো।

 

 

তৃতীয় অধ্যায়

ভারতীয় নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র

 

পশ্চিমা নিরীক্ষামূলক সিনেমার যাত্রা শুরু মূলত ‘টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট’ এর হাত ধরে আর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ, সুররিয়ালিজম ও দাদাবাদের মতো শিল্পান্দোলনের প্রভাব। ভৌগলিক ও ‘ঐতিহ্যিক’ পটভূমি পরিবর্তনের পথ ধরে ইন্ডিয়ান এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমা তার নিজস্ব রূপ ও গতিপথ নিয়েছে, যাকে অমৃত গঙ্গার বলছেন- ‘সিনেমা প্রায়োগা

মহাযুদ্ধ এসে অকস্মাৎ পাশ্চাত্য ইতিহাসের একটা পর্দা তুলে দিল। যেন কোন মাতালের আব্রু গেল ঘুচে। এত মিথ্যা এত বীভৎস হিংস্রতা নিবিড় হয়ে বহু পূর্বকার অন্ধ যুগে ক্ষণকালের জন্যে হয়ত মাঝে মাঝে উৎপাত করেছে, কিন্তু এমন ভীষণ উদগ্র মূর্তিতে আপনাকে প্রকাশ করেনি। তারা আসত কালো আঁধির মতো ধূলায় আপনাকে আবৃত করে, কিন্তু এ এসেছে যেন আগ্নেয়গিরির আগ্নেয়স্রাব, অবরুদ্ধ পাপের বাধামুক্ত উৎস উচ্ছ্বাসে দিকদিগন্তকে রাঙিয়ে তুলে; দগ্ধ করে দিয়ে দূর-দূরান্তের পৃথিবীর শ্যামলতাকে। তারপর থেকে দেখেছি ইউরোপের শুভবুদ্ধি আপনার পরে বিশ্বাস হারিয়েছে। আজ সে স্পর্ধা করে কল্যাণের আদর্শকে উপহাস করতে উদ্ধত। আজ তার লজ্জ্বা গেছে ভেঙ্গে, ...আজকাল দেখছি আপনাকে ভদ্র প্রমাণ করবার জন্যে সভ্যতার দায়িত্ববোধ যাচ্ছে চলে। অমানবিক নিষ্ঠুরতা দেখা দিচ্ছে প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে।

- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

রবীন্দ্রনাথের এই কথা ধরেই আমরা দেখতে পাই পশ্চিমা বিশ্বের স্বরূপ, তাদের ভগ্নপ্রায় অবস্থা, অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে যে বিশাল ইতিহাস, ঐতিহ্য, মিথ, পুরাণের নিজস্ব রীতি আর সংষ্কৃতির ভান্ডার রয়েছে যা এখানকার যাপনের দর্শনকে পৃথক করে তুলেছে ইউরোপের থেকে। প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের এই তফাৎ বুঝতে হলে আমাদেরকে পৌঁছাতে হবে হাজার বছরের মিথ-পুরান-দর্শন চর্চার কাছে। প্রাচ্য দর্শ্নের মূল ভিত্তিই হলো ‘বিস্তৃতি’, এপিকের কাঠামোতে সে চেতনাকে বদ্ধ করেনা বরং তাকে মুক্তি দেয়। আর এই দর্শন শিল্প সাহিত্যকে যেমনভাবে প্রভাবিত করেছে তেমনিভাবে সিনেমার ক্ষেত্রেও গড়ে তুলেছে নিজস্ব রীতি, বিশেষ করে ভারতীয় এক্সপেরিমেন্টাল সিনেমা, যাকে বলা হচ্ছে- ‘সিনেমা প্রায়োগা’ / ‘Cinema Prayoga

এখানে ‘প্রায়োগা’ শব্দটির সাথে প্রয়োগ বা প্রয়োজনের সম্পর্ক নয় বরং এর সাথে অনেক বেশি যুক্ত ‘ইয়োগা’ বা ‘যোগ’, ‘ধ্যান’ শব্দ। আর এই ‘প্রায়োগা’ শব্দের মধ্য দিয়ে প্রতীচ্য এক্সপেরিমেন্টাল থেকে প্রাচ্য বা ভারতীয় এক্সপেরিমেন্টাল পৃথক হয়ে উঠছে। ঠিক যেমন মানি কাউল এর কাছে-

The moment the eye looks through the camera it ‘appropriates’ the space it is filming by a dichotomous organization that splits the experience of that space into a fork: of being sacred and/or being profane. …This gives yet another dimension to the understanding ‘prayoga’, if I may say so. His philosophy of ‘abhed akash’ or undivided space and its application to cinematography is a part of his prayoga. He has been resisting the idea of the European concept of Renaissance perspective since it splits space into object-horizon polarity.

 

সিনেমা প্রায়োগার ‘প্রায়োগা’ শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় ‘প্রা + ইয়োগা’যেখানে ‘প্রা’ মানে prefix কে এক অর্থে engine বলা হচ্ছে। সংষ্কৃত এই শব্দ ‘প্রা’ শব্দের অর্থ হিসেবে ‘The Student’s Sanskrit English Dictionary’ বলছে ‘forward’; ‘forth’; ‘in front’; ‘onward’; ‘before’ আর একটি বিশেষ অর্থ প্রকাশ করতে ‘Vanguard’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। এছাড়া আরও কিছু শব্দ power, intensity, source, origin, completion, perfectness, excellence, purity ইত্যাদি। আর ‘ইয়োগা’ বলতে বোঝায় ‘charm’; spell, incantation, magic, magical art, substance, deep and distract meditation, concentration of mind, contemplation of the supreme spiritইয়োগা’র দার্শনিক ব্যাখ্যা স্বরূপ বলা হচ্ছেCittavritinirodha

ভারতীয় ‘সিনেমা প্রায়োগা’ কে নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা বলে এর বিস্তৃতিকে সংকুচিত করে দিতে নারাজ এই ঘরানার শিল্পীরা। এ ব্যাপারে মানি কাউল বলছেন-

In my mind too, the expression ‘experimental’ evokes an uncomfortable feeling. It does nothing more than marginalize serious work in cinema. In its implications, as commonly understood, the word creates a narrow focus on some kind of isolated cinematic activity. The word ‘prayoga’ is wider and more relevant.

 

‘সিনেমা প্রায়োগা’র কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রঃ

§  Mani Kaul এর Uski Roti (১৯৬৯), Satah Se Uthata Aadmi (১৯৮০), Siddeshwari (১৯৮৯), Naukar Ki Kameez (১৯৯৯), A Monkey's Raincoat (২০০৫);

§  Kumar Shahani এর Maya Darpan (১৯৭২), Khayal Gatha (১৯৮৯), Kasba (১৯৯০);

§  Kamal Swaroop এর Om-Dar-Ba-Dar (১৯৮৮), Pushkar Puran (২০১৭);

§  Amit Dutta এর Kramasha (২০০৭), Aadmi Ki Aurat (২০০৯), Nainsukh (২০১০);

§  Pramod Pati এর Explorer (১৯৬৮), Trip (১৯৭০), Abid (১৯৭২);

§  D. G. Phalke এর Raja Harishchandra (১৯১৩);

§  Vipin Vijay এর Video Game (২০০৫), A Flowering Tree (২০০৭);

§  S.N.S. Sastry এর And I Make Short Films (১৯৬৮), This Bit of That India (১৯৭২);

§  Vijay B. Chandra এর Child on a Chess Board (১৯৭৯);

§  Ashish Avikunthak এর Kalighat Fetish (১৯৯৯), End Note (২০০৫), Vakratunda Swaha (২০১০), Rati Chakravyuh (২০১৩);

§  Amitabh Chakraborty এর Kaal Abhirati (১৯৮৯), Bishar Blues (২০০৬);

§  Nalini Malani এর Unity in Diversity (২০১৩);

§  Anita Dube এর Garam Hawa (২০০৪);

§  Ashim Ahluwalia এর A Short Season (১৯৯৫);

§  Shumona Goel এবং Shai Heredia এর I Am Micro (২০১২) প্রভৃতি।

 

বিশ্ব চলচ্চিত্র পরিমন্ডলে যখন নিরীক্ষামূলক সিনেমা নানা পর্যায় অতিক্রম করছে তখন ভারতীয় ‘সিনেমা প্রায়োগা’ তার নিজের যে স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করছে সে যাত্রায় ঋত্বিক ঘটক আমাদের আলোচ্য। ‘সিনেমা প্রায়োগা’র অন্তর্নিহিত বীজ আমরা ঋত্বিক ঘটকের কাজের মধ্য দিয়ে দেখতে পাই। জাতিসত্বার অনুসন্ধান, মিথিক পরিচয়, ঐতিহ্যকে ধারণ করার প্রয়াস তাঁর সিনেমায় বরাবরই স্থান পেয়েছে। সে আধারকে ধরতে নানা নিরীক্ষামূলক আধেয়ের আশ্রয় নিয়েছেন -

চলচ্চিত্রে পরীক্ষা একটি বিরাট এবং কৌশল সমন্বিত প্রসঙ্গ। কখনও কখনও পরীক্ষামূলক ছবিকে ‘শিল্পগুণ বিশিষ্ট’ ছবি বলা হয়। যেকোন মাধ্যমে পরীক্ষা তার সম্ভাবনা সমূহের বিস্তৃতিকে বোঝায়। যেসব ব্যক্তি আত্মপ্রকাশের অন্বেষণ করেন, পরীক্ষামূলক ছবি দিয়ে তারা চলচ্চিত্রে নতুনের সন্ধান করেন। এইসব ছবির প্রত্যেকটিই শিল্পীর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ এবং সব সময়ই সে রকম একটি ব্যক্তি মনের নির্মাণ।১০

এছাড়া তিনি আরো বলেছেন, চলচ্চিত্রে পরীক্ষা দু’ রকমের হতে পারেঃ

১। মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা
২। মাধ্যম নিয়ে অন্য কোন উদ্দেশ্যের জন্য প্রয়োগ। ১১

প্রকাশের মাধ্যমটিকে নিয়ে পরীক্ষা তিন ধরনের হতে পারে-

ক. যান্ত্রিক-আঙ্গিকগত
খ. শৈল্পিক
গ. পরাবাস্তব

যান্ত্রিক আঙ্গিকগত নিরীক্ষার ক্ষেত্রে মাধ্যম ও টেকনোলজি নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। যেমনঃ Norman McLaren এর ‘Pen Point Percussion, ‘Synchromy’ সেখানে তিনি শব্দ নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। এছাড়া ১৯২৮ এ Abel Gance তিন ধারার পর্দা ব্যবহার করে তাঁর ‘নেপোলিয়ন’ তৈরী করেন। এ কাজগুলো মূলত যান্ত্রিক আঙ্গিকগত অর্থে পরীক্ষামূলক।

শৈল্পিক নিরীক্ষার মধ্যে পড়ে বৃত্ত, রেখা, রঙ, সঙ্গীত নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা। রেখা, রঙ দিয়ে আবেগের মেজাজ সৃষ্টি করা যায়। আর সঙ্গীত শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বিমূর্ত। যে মেজাজ আবেগ, রেখা, রঙ দিয়ে প্রকাশ করা না যায় তা সঙ্গীতের মাধ্যমে যায়ঃ Walt Disney-র ‘Make Mine Music’ (১৯৪৬), যেখানে ৯০০ থেকে ১০০০ ফুটে সঙ্গীতের বিমূর্ত প্রয়োগ রয়েছে।

এছাড়া আছে পরাবাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গি। আর এ ধারার প্রধান হলেন সালভাদর দালি আর বুনুয়েল। বুনুয়েলের L’ Age D’orLa chien Andalou সিনেমা উল্লেখযোগ্য।

মাধ্যম নিয়ে অন্য কোন উদ্দেশ্যের জন্য প্রয়োগ অর্থে ঋত্বিক বলতে চান ছবির মাধ্যমে বাইরের জগতকে আবিষ্কার করা এবং এর মধ্য দিয়ে জাতিসত্বার অন্তর্নিহিত মননে পৌঁছানো

আন্দামানের জংলীদের এবং নাগাল্যান্ডের আন্দামানের মতো কয়েকটি উপজাতি আছে। ভারতীয় জীবন ও সংষ্কৃতির বিকাশ তারা একটি ছোট স্রোতধারার মতো। তাদের জীবনের ওপর ছবি, তাদের প্রথা-উৎসব-দেবতা (প্রত্যেক উপজাতির ‘দেবতা’ আছে, যা টোটেম নামে পরিচিত) ইত্যাদির নৃতত্ব, তাদের স্রষ্টারা পৃথিবীর দূরতম কোণে তাদের ক্যামেরা নিয়ে যান এবং প্রচুর বাধা বিপত্তি সহ্য করে যারা তাদের অভিজ্ঞতায় যেমন পান, সেই রকম চিত্রিত করেন। তারা আমাদের থেকে অনেক বেশি সংযত। জগতের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত, তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। ......আমার দেশের লোকদের না জানলে আমি ছবি তৈরী করতে পারবোনা। ১২



চতুর্থ অধ্যায়

 

ঋত্বিক পরবর্তী সময়ে তাঁরই শিষ্যদের যে ‘সিনেমা প্রায়োগা’ নির্মাণ প্রচেষ্টা তার শুরুটা এই ‘আমার দেশের লোকদের জানার’ মধ্য দিয়ে, নিজ জাতিসত্তার কাছে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে। ভারতীয় নিরীক্ষামূলক সিনেমা বা ‘সিনেমা প্রায়োগা’ বীজ যে সিনেমার মধ্য দিয়ে নিহিত ছিল তা হলো ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) এবং ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৭)।

ঋত্বিক ঘটক মোট আটটি কাহিনীচিত্র করেছেন। ‘নাগরিক’ (১৯৫৫) থেকে শুরু, এরপর একে একে ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮), ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৮), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১), ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২), ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩), ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৭) করেছেন। প্রতিটি সিনেমার ক্ষেত্রেই তিনি নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন, করেছেন নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা।

ঋত্বিক নিজেই বলেছেন, তাঁর ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ অন্যান্য ছবির থেকে আলাদা। একটা শিশুর চোখে মহানগর। এ ছবিতে বিশেষ লেন্স ও বিশেষভাবে টেকনিক্যাল কাজ করেছেন। সাউন্ডের ট্র্যাকও বিশেষভাবে বাজিয়েছেন- যেমনঃ যে স্পিডে মিউজিক টেক করেছেন তার প্রায় তিনগুণ স্পিডে ট্রান্সফার করে ছবিতে ব্যবহার করেছেন। একইভাবে ‘অযান্ত্রিক’ সিনেমাতেও আছে নানা টেকনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষাতিনি নিজেই বলছেন-

অযান্ত্রিক তার প্রকাশরীতি পরিমিতিবোধ ও কিছু কারিগরী নিপুনতার জন্যে। ‘সুবর্নরেখা’ আমার ধারনায় আমার সবচেয়ে দার্শনিক ছবি। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’- বাংলাদেশের পল্লীপ্রকৃতির গীতিকাব্যময়তা নিয়ে এক নিবন্ধ বিশেষত বর্ষাকালের। তাছাড়া আমার বিশ্বাস দুঃস্থ শ্রমিকশ্রেণীর কয়েকজনকে এখানে তুলে ধরতে পেরেছি; যারা একান্তভাবেই বাঙালি। এছাড়া আছে- কোমল গান্ধার, যেখানে আমি প্রচলিত গল্পের ছকটাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি এবং একই সঙ্গে আমার প্রতিপাদ্যকে চারটি স্তরে বিন্যস্ত করে তুলে ধরেছি। ১৩

 

আমাদের যে মূল আলোচ্য বিষয় ভারতীয় নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র বা ‘সিনেমা প্রায়োগা’ এবং সেই সিনেমার অন্তর্নিহিত বীজ আছে ঋত্বিকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ তে। ভারতীয় নিরীক্ষামূলক সিনেমায় যেহেতু টেকনিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা নয়, বরং গুরুত্ব পেয়েছে দার্শনিক, ঐতিহ্যিক, কাব্যিক যাত্রা, জীবনকে দেখতে চেয়েছে এপিকের বিস্তার নিয়ে।

আর এপিকের চরিত্রধর্ম ও মিথ, পুরাণ, ইতিহাসের মধ্য দিয়ে নিজেদের জাতিসত্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার হাত ধরে।

এ ছবিতে কোন রাজনীতির কচকচি নেই, উপন্যাসটা আমার নিজের ধারণায় এপিকধর্মী, এ ছবিতে আমি প্রথম এই ঢঙটা ধরার চেষ্টা করেছি। ১৪

ঋত্বিকের পূর্ববর্তী সিনেমাতে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ও ‘সুবর্ণরেখা’তে এপিকের লক্ষণ দেখা যায়। এ সিনেমাগুলিতে সাউন্ড মন্তাজ সৃষ্টিতে ও আর্কেটাইপ ইমেজ তৈরীতে এপিকধর্মীতার লক্ষণ, যেমনঃ ‘সুবর্নরেখা’য় মায়ের মৃত্যু দৃশ্য সিকোয়েন্সে মায়ের মৃত্যুর ফলে যে ব্যথার তীব্রতা তা ট্রেনের সাউন্ড মন্তাজের মধ্য দিয়ে দর্শকের মনে ছড়িয়ে পড়ে। এপিক কোন এক-কেন্দ্রাভিমুখতায় পৌঁছায় না, বরং ভাবনার জায়গা রাখে অনেক। ‘সুবর্ণরেখা’ বা ‘মেঘে ঢাকা তারা’র যাত্রা তাই শেষ হয়েও শেষ হয়না। নীতার যাত্রা বা নতুন বাড়ি খোঁজার যাত্রা কখনোই শেষ হয় না। কিন্তু ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ঋত্বিক সচেতনভাবে এবং সার্থকভাবে এপিক ফর্ম ব্যবহার করেছেন। ঋত্বিক তাঁর শিল্প ভাবনার মুক্তি খুঁজেছেন এপিকে, তাই এই চলচ্চিত্রে সেই এপিক ফর্মকে সার্থকভাবেই ব্যবহার করেছন তিনি। এপিক ফর্মে প্রপস, কস্টিউমস, লৌকিক আচার, সঙ্গীত, প্রকৃতি ও হিউম্যান ফিগার প্রত্যেকটি উপাদান স্বতন্ত্র ‘চরিত্র’ হয়ে ওঠে। ‘তিতাস’ কে তাই আমরা কেবল বাসন্তীর বা রাজার ঝি এর আখ্যান বলতে পারিনা, এখানে মানুষ ও প্রকৃতি সমান গুরুত্ব পেয়ে প্রকাশিত হয়েছে, যা মূলত বের্টল ব্রেখটের separation of element এবং এপিকের বৈশিষ্ট্য।

মানি কাউল তাঁর এক সাক্ষাৎকারে ‘ঋত্বিক ও তার এপিক ফর্ম’ সম্পর্কে বলেছেন-

Epic form is just the opposite of this (dramatic form) which means that the narrative is usually very thin, is very spread out and at every stage as it develops, it is actually trying to have wider perspectives, not just upon the characters but upon nature, upon history, upon ideas there are of existence, there are of not just of description of society but visions of epics that have gone. So it must not just be a simple movement of a narrative but as it narrates that story, it just also embrace, it spread out. Let’s say in case of Titash Ekti Nadir Naam upon the boat, upon rain, upon nature, upon the archetypes of mother, which reveal in case of Titash the form of mother is Bhagavati for example. And even the main character is referred to as Bhagavati with you by fishermen when they bring her back to the village which is supposed to be her husband’s village. ১৫


১ম পরিচ্ছেদ

 

তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)

 

এপিকের বৈশিষ্ট্যই হলো আগে থেকেই কি ঘটতে চলেছে তার ইঙ্গিত দিয়ে দেওয়া। ‘সুবর্নরেখা’ ও ‘মেঘে ঢাকা তারা’র ক্ষেত্রেও আমরা আগেই পরিণতির ইঙ্গিত পেয়ে যাই। আর অনুমেয় পরিণতিকে প্রকাশ করার জন্যই প্রয়োজন পড়ে মেলোড্রামা। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমার বেলায় মাঘমন্ডলের ব্রতের পরেই বাসন্তীকে যখন নদীর ঘাটে অপেক্ষা করতে দেখি, সেখানে রামপ্রসাদ জ্যাঠা আসে এবং তারই মুখে আমরা আসন্ন তিতাসের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাই- 

এই রকমই হয় মা, এই সব আছে, এই নাই। এই বাত্তি জ্বইলা ওঠে, এই সব নিবা যায়, হদিস মেলেনা। এই কাইল তুই ছোট ছিলি, আজ বড়ো হইছোস। এই তিতাসের জলে হয়তো দেখমু শুকনা, খটখইট্টা, ড্যাঙা। মরণকালে যে জলটুকু না খাইলে পরানটা তক বাইর হয়না, একদিন হয়ত দেখমু তিতাসে সেই জলটুকুও নাই।

এই আখ্যানের চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য ঋত্বিকের পূর্ববর্তী আখ্যানগুলোর চাইতে ভিন্নতর- এর বিষয় ঋত্বিকের যাপিত জীবনের কোন পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তাই এই চলচ্চিত্রে ঋত্বিক নিজেকেও বিযুক্ত করতে পারলেন এই প্রথম।

রামপ্রসাদ জ্যাঠার ছোট বাসন্তীকে বলা কথাগুলার ঠিক পরেই আমরা দেখতে পাই পরপর কিছু ডকুমেন্টরি ফুটেজঃ প্যান শটে বিস্তীর্ণ তিতাস, নদীতে নৌকার বহর, নদীপাড়ের শিশু, পুরুষ, মহিলার ঠিক ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হেঁটে আসা। আবার রাজার ঝি’র নদীতে ঝাঁপ দেয়ার পর, অথবা বাসন্তীর মায়ের সাথে ঝগড়ার পর, অনন্তের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বারবার ঋত্বিক প্রকৃতিকে সময় দিচ্ছেন। প্রতিটি নৌকা, বৃষ্টি, ল্যান্ডস্কেপ, গাছকে এগুলো ড্রামাটিক ফিল্মের মত কেবল উপাদান বা স্টাবলিশিং শট নয় কিংবা কেবলই তিতাসকে প্রতিষ্ঠা করা নয় বরং তাঁর ফ্রেমের প্রত্যেকটি উপাদান স্বতন্ত্র ও নিজস্ব অর্থ বহন করে আলাদা মর্মার্থে রুপায়ন করছেন, পৃথক করছেন। Separation of elements এইভাবে প্রকৃতিকেই গুরুত্ব সহকারে দেখছেন, যেন আখ্যানের চরিত্রগুলি নয়, প্রকৃতিই যেন হয়ে উঠছে প্রধান। আখ্যানের মধ্যে চরিত্রকে ধারণ করার জন্য সহায়ক হিসেবে প্রকৃতি নয়, বরং প্রকৃতিকেই যেন ধারণ করার মাঝে মাঝে চরিত্রগুলি আসছে। মাদার আর্কেটাইপ চরিত্র ও অন্যান্য চরিত্রগুলি প্রকৃতির সাথে মিশে যাচ্ছে। এভাবে প্রকৃতিকে ব্যবহার করাই ‘মেডিটেশন’, অর্থাৎ ‘প্রায়োগা’র লক্ষণ

তিতাস কোনভাবেই এক রৈখিক আখ্যান নয়। এমনকি কোন একজন প্রধান চরিত্রকে ধরে না এগিয়ে, বরং অনেকগুলো চরিত্রকে প্রধান ধরে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিতাসের নারীরা মা হয়ে আসে, প্রতিবাদ করে ভরা মজলিসে, আত্মরক্ষা করে পুরুষের সাথে শক্তি খাটিয়ে, আড্ডায় বসে কেচ্ছা-তামাশা করে পুরুষদের কান্ড-কারখানা নিয়ে, নদীতে পুরুষের সাথে একসাথে গোসল করে, ক্রুদ্ধ হয়, আবারও মা হয়ে ওঠে এখানে আখ্যানকে এগিয়ে নিয়ে যায় নারীরাই তিতাসে নারীরা আবক্ষ উন্মোচিত, সাবলীল, শক্তিশালী। আমাদের হাজার বছরের নৃতাত্বিক চিত্র। এই যে নারীরা আবক্ষ উন্মোচিত হয়ে গোসল করছে, সেখানে ইউরোপের মতো নারীদের প্রতি পুরুষদের ‘মেল গেজ’ দৃষ্টিভঙ্গি নেই, যা আমাদের এই অঞ্চলের নৃতাত্বিক রূপকিন্তু মালোসমাজের ভাঙ্গন, মহাজনী, জমিদারি, বাবুসমাজের শোষণ যখন তীব্র তখন আমরা দেখতে পেয়েছি এই দৃষ্টিভঙ্গি

তিতাসের ফ্রেম কখনও ফাঁকা থাকে না। যেখানেই প্রধান চরিত্র আছে, সেখানেই ফ্রেমে শুধু সেই প্রধান চরিত্রই নয়, সাথে অনেক বেশি মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। উজানীনগরে দোল উৎসব, গোকর্নঘাটে কিশোরকে গোসল করানো, পরস্তাব এর আসর, গোকর্নঘাটে দোল উৎসব- সবখানেই এই উদাহরণ।

উপন্যাসের কাহিনীর মৌল বয়নের সঙ্গে অন্তবয়নে উপস্থাপিত হয় নানা কৌমসংস্কৃতি; বাখতিন কথিত ‘carnival folk culture’প্রাকৃত জীবনের পাশাপাশি মাঘ মন্ডলের ব্রত উদযাপন, কুমারীর চৌয়ারি ভাসানো, নৌকা যাত্রার বিবরণ, দোল পূর্ণিমার উৎসব, রাধা কৃষ্ণের গান, ব্রাত্যজনের বিবাহযাত্রা ও মালাবদল, ওরাল লিটেরেচার এইসব লোকসংস্কৃতিক প্রতিবেদন উপস্থাপন অদ্বৈত মল্লবর্মণের যেমন কেন্দ্রীয় অনিষ্ট, তেমনি ঋত্বিকও প্রত্যেকটি উপাদানকে তাঁর চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছেন, দর্শক হিসেবে আমরাও ব্রাত্যজীবনের নানা বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে উঠি। খুবই প্রাণবন্ত চমৎকার একটি দৃশ্য হলো উদয়তারা’র ‘পরসতাব’ বলার সিকোয়েন্স। এখানে ঋত্বিক ওরাল লিটেরেচারকে উপস্থাপন করেছেন। সবই আমাদের বাঙলার সামষ্টিক জীবনের প্রতিরূপ, আমাদের জাতিসত্তা

 

২য় পরিচ্ছেদ

 

যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭)

 

প্রত্যেকটি শিল্পকর্ম আলাদা। এখন প্রত্যেক শিল্পের যে ভঙ্গি সেটা জন্মগ্রহণ করে তার থিম থেকে, তার চিন্তাদর্শন থেকে। তা এই পার্টিকুলার হবিতে আমার একটা কিছু চিন্তা ছিল, তার উপযুক্ত বলে যাকে আমি মনে করেছি, সেইভাবে করেছি। কাজেই ভঙ্গি পাল্টানোর কোনো যুক্তি নেই। ওটা হচ্ছে... জন্মগ্রহণ করে চিন্তা থেকে। তা আমার কন্টেন্ট যেটা ছিল, তাতে এই ফর্ম আমাকে ধরতে হয়েছে, আমি ধরেছি। ১৬

- ঋত্বিক ঘটক

একই ধরনের ভিজ্যুয়াল স্টাইল মেনে এগিয়েছে ‘তিতাস’ পূর্ববর্তী সিনেমা কিন্তু তিতাসে মাল্টিপল ভিজ্যুয়াল স্টাইল অনুসরণ করেছেন, আর ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ তে এসে নিজের গড়া সমস্ত ভিজ্যুয়াল স্টাইলকে ভেঙ্গে দিয়েছেন।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমা প্রায়োগা নয়, তবে সিনেমা প্রায়োগা’র লক্ষণসমূহ এতে প্রকাশিত। ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ তে এসে তার পূর্ণ পরিস্ফূটন হয়।

যুক্তি তক্কো আর গপ্পো পূর্ববর্তী সিনেমাগুলিতে ঋত্বিক একটি আখ্যানকে ধরে এগিয়েছেন। যেমনঃ ‘মেঘে ঢাকা তারা’ আর ‘সুবর্নরেখা’কিন্তু এই সিনেমার প্রথম নিরিক্ষা তিনি করলেন আখ্যানহীনতা দিয়ে। এখানে মূলত তার নিজের শিল্পীসত্তা, স্মৃতি, অভিজ্ঞান, অসমাপ্ত জীবনের অভিপ্সা, ভারতের স্বাধীনতার অন্তঃসারশূন্যতা- কয়েকটি বিক্ষিপ্ত চরিত্রের মাধ্যমে যুক্তি, তর্কের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। এই সিনেমায় ‘গপ্পো’ আছে কিন্তু তা কেবল বক্তব্যকে প্রকাশ করার জন্য। ঋত্বিকের নিজের মতে-

একাত্তরের গোড়ায় কলকাতার রকে বসে কলকাতাটাকে খুব ওতপ্রোতভাবে দেখা গিয়েছিলো। ...বড়লোকদের মধ্যে ঢুকে পড়ে তাদের রিএকশনগুলো আমি দেখেছিঃ তাই আমি সমাজের প্রতিটি স্তরকে কেটে দেখা এবং দেখানোর চেষ্টা করেছি। আড়ম্বরটা শুধু আমার জীবনের কিছু ঘটনা দিয়ে। ১৭

- ঋত্বিক ঘটক

মূলত যে সমাজকে তিনি চোখ দিয়ে দেখেছেন তাকেই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি বলছেন- “It is completely a political filmরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পটভূমি তখন যেমন ছিল, যেমন দেখেছেন শহরে অথবা গ্রামে তাকেই রূপ দিয়েছেন এই সিনেমায়। তাই এই সিনেমা ব্যক্তিগত হয়েও ভীষণভাবে সমাজবর্তী।

 

গপ্পো না করেও হাজার বছরের শোষণের গল্পটা বলে দেন সিনেমার শুরুতেই। এক লোলচর্ম বৃদ্ধের স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার মধ্য দিয়ে। বৃদ্ধের পয়েন্ট অভ ভিউ থেকে দেখানো ভূত নৃত্য থেকে বুঝা যায়- আমরা হাজার বছর পরেও ঐ একই ভূতের নৃত্য করে যাচ্ছি। শুধু ‘উত্তর মেলে না’ (সুবর্নরেখা)। এই উত্তর ঋত্বিক মেলাতে চাননি, তিনি কোন সমাধানও দিতে চাননি। শুধু জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখেছেন, যা বুঝেছেন, তাকেই সিনেমায় চিত্রিত করবার বাসনা তার।

পুরো সিনেমায় বৃদ্ধকে তিন বার দেখানো হয়ঃ শুরুতে, মাঝে ও শেষে। ঝুপড়ির নিচে বসে থাকা বৃদ্ধের পিছনে ফসলহারা ধু ধু প্রান্তর। বৃদ্ধ চরিত্র সম্পর্কে ঋত্বিক বলছেন-

হাজার বছর ধরে আমার চাষী বসে আছে। আর তোমরা নেচে কুঁদে যাচ্ছো। সক্কলে নচ্ছার। ছবি আরম্ভ হচ্ছে এক বুড়োকে দিয়ে। আর কিছু নেই। শেষও হয়েছে সেই বুড়োকে দিয়েই। বুড়ো বসেই আছে। সে কাশছে। কী করবে? আর দাদারা শখ করে খাচ্ছে। বাকতাল্লা বাজিয়ে বড় বড় কথা! হেন তেন। সকলেই দেশের মুক্তি আন্দোলন পকেটে করে বসে আছে। ...সব গদির জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে। এই তো বক্তব্য আমার। ...আমি জানিনা সলিউশন। আমার কাছে কোন থিওরি নেই।১৮

 

ঋত্বিক এখানে বারবার আমাদের অঞ্চলের গান, নৃতাত্বিক সঙ্গীত আবার পশ্চিমের সঙ্গীত, বিথোভেন এর সিম্ফোনি ব্যবহার করছেন। বারংবার ‘টোটালিটি’কে ধরতে চাচ্ছেন। আপাত বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কতগুলো চরিত্রের মধ্য দিয়ে ছোট ছোট কোলাজ সৃষ্টি করেছেন। টুকরো টুকরো কোলাজ ব্যবহার করছেনকোলাজ ব্যবহারের মাধ্যমে আখ্যানের আদি-মধ্য-অন্তঃ যে ধারাবাহিকতা তাকে ঋত্বিক ভেঙ্গে ফেলছেন। ঋত্বিকের সব ছবিতে যেমন আলোর ব্যবহার, এই ছবিতে সেরকম আলোর ব্যবহার নেই।

আখ্যানহীনতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে এই সিনেমার চরিত্রগুলি। যাদের নামের মধ্য দিয়ে একেকটি রূপকল্প প্রকাশ পেয়েছেঃ

নীলকন্ঠ - যে সমাজের সমস্ত গরল পান করে আশা করে সমাজের ক্লেদ, দুঃখ, গ্লানি, শোষণ, যন্ত্রণা, তার বিষতুল্য মদ্যপানের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্হিত হবে।

দুর্গা - যে আশ্রয় দেন, আবার শাসনও করেন।

নচিকেতা - যে সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করে।

বঙ্গবালা - যে বাংলাদেশের তাপদগ্ধ, কিন্তু করুণাময়ী প্রেরণা।

জগন্নাথ - যে ভারত আত্মার ঐতিহ্যের স্মৃতিবাহী।

সত্য - তার পুত্র সত্য। এই নামের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের শোষণের সঙ্গবদ্ধতার লৌকিক আচার অনুষ্ঠানের মাতৃরূপকল্পের সর্বোপরি ঋত্বিকের যাপিত জীবনের সমস্ত সত্যকে ধারণ করতে চেয়েছে এই শিশুর নামের রূপকল্পের মধ্য দিয়ে।

 

আমার ছবিতে আমি চরিত্রগুলিকে পার্থিব জগতের সাথে যুক্ত করে রাখি। ছোয়া দিয়ে আটকে রাখি – তারপরে কিন্তু তারা একেকটা চিন্তাগত ব্যক্তিত্ব গ্রহণ করে। ...যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ছবিতে শাওঁলি’র চরিত্র (বঙ্গবালা) ঠিক বাস্তব চরিত্র নয়, কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে তার নাড়ির যোগ সম্পূর্ণ...। এই চরিত্রের মধ্যে আমি সারা বাংলাদেশটা প্রতিভাত করার চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশের ছবিতে বাঙালি মেয়েদের সবসময় দেখা যায়- ন্যাকা ন্যাকা, আহ্লাদে পুতুপুতু। কিন্তু বাঙালি মেয়ে তা নয়। আমি তাই এনেছি এক তেজোদীপ্ত মেয়ে। আর তার মধ্য দিয়ে সমস্ত বাংলাদেশের আত্মাকে ধরার চেষ্টা করেছি। কথা হচ্ছে সমস্ত ছবিতে আমি কিছু না কিছু ধারণা ভাবনা একটা চরিত্র দিয়ে ফুটাতে চেষ্টা করি। ১৯

 

সিনেমা ঋত্বিকের কাছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি। অর্থাৎ পার্সোনাল স্টেটমেন্ট। যুক্তি তক্কো আর গপ্পো সিনেমাতে সেই পার্সোনাল স্টেটমেন্টকে নিয়ে তিনি যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তা তার পূর্ববর্তী সমস্ত নিজস্ব স্টাইলকে ভেঙ্গে এক নতুন স্টাইল তৈরী করেছে। সাহানির বিবেচনায়- “আঙ্গিকের রূপায়ন নিয়ে কখনও নিজেকে প্রদর্শোন করতে চাননি। এবং আমার মনে হয় শেষ ছবিতে তিনি এ ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন ছিলেন।২০ উদাসীন হলেও ঋত্বিক শেষ সিনেমাতেও তার নিজস্ব ছাপ রেখে যেতে ভুলেননি। যা ভারতীয় নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রকে তারই শিষ্যরা একধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

 

 

পঞ্চম অধ্যায়

উপসংহার

 

শিল্পের নিরীক্ষা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। সিনেমার ক্ষেত্রেও এই নিরীক্ষা সিনেমার ইতিহাসের শুরু থেকেই লক্ষনীয়। কিন্তু নিরীক্ষাধর্মী সিনেমা শুধুই বিচ্ছিন্নভাবে টেকনিক্যাল বা মেকানিক্যাল চর্চাকে বোঝায় না, কিংবা নতুন নতুন এঙ্গেল এর শটের সংযোজনও নয়। নিরীক্ষাধর্মী সিনেমার পেছনে দু’ দুটো মহাযুদ্ধের প্রভাব, সভ্যতার অন্তঃসারশুন্যতা আর শিল্পের বিভিন্ন আন্দোলন ক্যাটাস্ট্রপি’র মতো কাজ করেছে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে যে নিরীক্ষা চলেছে, ভারতীয় চলচ্চিত্রে নিরীক্ষার যাত্রাপথ একেবারেই ভিন্ন। নিজস্ব মিথ, পুরান, ইতিহাস, ঐতিহ্য, হাজার বছরের যাপিত জীবনকেই ধরবার চেষ্টা করা হয়েছে ‘মেডিটেশন’ এর মধ্য দিয়ে। যার জন্য একে সিনেমা প্রায়োগা বলা হচ্ছে।

সিনেমা প্রায়োগা’র তালিকায় যদিও তিতাস নির্মাণেরও আগের ঋত্বিক ঘটকেরই ছাত্র ১৯৬৯ এ মানি কাউল এর ‘উসকি রোটি’, কিংবা ১৯৭২ এ কুমার সাহানির ‘মায়া দর্পন’ থাকলেও, এমনকি অমৃত গঙ্গার এই তালিকায় ফালকে’র ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ কে রাখলেও আমরা বলতে চাচ্ছি তিতাস এবং যুক্তি তক্কো সিনেমা দুটির চিত্রনাট্য করার পর্যায়েই ঋত্বিকের সকল দর্শন সম্পর্কে অবহিত হন তার ছাত্ররা, যে অবদানের কথা তার ছাত্ররা পরবর্তীতে অকপটে স্বীকার করেছেন, এবং এই সিনেমাদ্বয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রায়োগা’র বীজ লক্ষণ প্রকাশিত হয়।

ভারতীয় নিরীক্ষামূলক সিনেমার যাত্রা শুরু তিতাস কিংবা যুক্তি তক্কো দিয়ে নয়। তবে ঋত্বিকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ তে প্রচলিত অর্থে সিনেমা দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তাকে যেমন ভেঙ্গে দিয়েছে তেমনি আখ্যান বর্ণনায় বা আখ্যানহীনতায় ঋত্বিক আত্মস্থ করেছে এপিক ট্র্যাডিশন। এপিক ট্র্যাডিশনকে, তার ভিতরকার মিথলজি, বিশেষ গ্রেট মাদার ইমেজকে ভেবে-চিন্তেই ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ তে ব্যবহার করেছেন। তার মতে- “মহীয়সী মাতা (গ্রেট মাদার ইমেজ), তার যে দুই রূপঃ বরাভয় ও ভয়ংকরী। এদের সঙ্গে আমাদের সভ্যতার নিবিড় ঘনিষ্টতা সেই আদিকাল থেকে। এবং আমাদের পুরাণ, আমাদের মহাকাব্য, আমাদের শাস্ত্র ও আমাদের লোককথা- তার স্তরে স্তরে এই মৌল প্রতীকটি আমাদের জড়িয়ে রেখেছে। ২১ এভাবেই এই দুটি চলচ্চিত্র পরবর্তী যুগে ভারতীয় নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রের বীজ, শেকড় হিসেবে কাজ করেছে।

 

 

পরিশিষ্ট

 

১। Ghatak, Ritwik, Cinema & I, Ritwik Memorial Trust, Kolkata, 2015

২। আউয়াল, সাজেদুল, চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর, ঢাকা, ২০১১

৩। প্রাগুক্ত

৪। Pramaggiore, Maria and Wallis, Tom, Film: A Critical Introduction, London, 2005

৫। MoMA-Experimentation in Film-The Avant-Garde

৬। ঘটক, ঋত্বিক, নিরীক্ষামূলক ছবি, চিত্রবীক্ষণ, অনিল সেন (সম্পা), কলকাতা, ১৯৮৪

৭। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, সভ্যতার সঙ্কট, কালান্তর, ঢাকা, অক্টোবর-২০১২

৮। Kaul, Main, Concepts of space: Ancient and Modern, Ed Kapila Vatsayayan, Abhed Akash (Undivided space), Udayan Vajpayee

৯। Interview of Mani Kaul, Cinema Prayoga, Amrit Gangar

১০ ঘটক, ঋত্বিক, পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র চর্চা, সম্পাঃ বিভাস মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ২০১৭

১১। প্রাগুক্ত

১২। প্রাগুক্ত

১৩। নান্দনিক যোগ্যতাই একমাত্র মানদন্ড, কল্পনা বিশ্বাস গৃহীত সাক্ষাৎকার- ঋত্বিক ঘটক, কবিতীর্থ, ঋত্বিক কুমার ঘটক সংখ্যা, সম্পা. উৎপল ভট্টাচার্য, ১৯৮২

১৪। সিনেমার প্রেমে মশাই আমি পড়িনি, সাক্ষাৎকার- ঋত্বিক ঘটক, সাক্ষাৎ ঘটক, সম্পা. শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য, কলকাতা-২০০০

১৫। Nasreen Munni Kabir in conversation with Mani Kaul (2008)

১৬। ঋত্বিক কুমার ঘটক, সম্পা. অতনু পাল, কলকাতা-২০১৮

 

১৭। ঋত্বিক ঘটকঃ একটি সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎ ঋত্বিক, সম্পা. শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য, কলকাতা, ২০০০

১৮। প্রাগুক্ত

১৯। Ghatak, Ritwik, Cinema & I, Ritwik Memorial Trust, Kolkata, 2015

২০। সাহানি, কুমার, “হিংসা এবং দায়িত্ব”, কবিতীর্থ, পাদটিকা নং ৩৩৮, সম্পা. উৎপল ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৯৮২

২১। ঘটক, ঋত্বিক, চলচ্চিত্র চিন্তা, সাক্ষাৎ ঋত্বিক, সম্পা. শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য, কলকাতা, ২০০০