Interview Feature Film Open Access

'আমাদের সিনেমার ভাষাভঙ্গি নির্মাণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাছে ফেরাটা জরুরি' - আলাপচারিতায়: এন রাশেদ চৌধুরী ও চন্দ্রাবতী কথা

Rudra Kawser 27 June 2026
'আমাদের সিনেমার ভাষাভঙ্গি নির্মাণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাছে ফেরাটা জরুরি' - আলাপচারিতায়: এন রাশেদ চৌধুরী ও চন্দ্রাবতী কথা

Synopsis

চলচ্চিত্র নির্মাতা এন. রাশেদ চৌধুরীর এই সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের সিনেমার নিজস্ব ভাষা ও নন্দনতত্ত্ব বিনির্মাণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অপরিহার্যতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, পশ্চিমা চলচ্চিত্র শৈলীর অনুকরণ না করে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে 'ময়মনসিংহ গীতিকা' বা পালা গানের মতো লোকজ ও মৌখিক ঐতিহ্যকে সিনেমার রূপক ও আখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা জরুরি, যা তিনি তাঁর 'চন্দ্রাবতী কথা' চলচ্চিত্রে প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। সাক্ষাৎকারে বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের উদাহরণ টেনে দেশীয় কৃষ্টির সাথে সিনেমার সংযোগ স্থাপনের গুরুত্ব আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের পথে সেন্সর বোর্ডের আমলাতান্ত্রিক বাধা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং বাণিজ্যিক চাপের নেতিবাচক দিকগুলো কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছে। পরিশেষে, স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে এবং নতুন নির্মাতাদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরিতে চলচ্চিত্র সংসদ ও শর্ট ফিল্ম ফোরামের মতো সম্মিলিত প্ল্যাটফর্মের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

রুদ্র কাওসারঃ ‘চন্দ্রাবতী’। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের একজন চরিত্র। হঠাৎ আমাদের সিনেমা মধ্যযুগের টেক্সট থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছে কেন?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ আসলে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আমি যখন পড়াশোনা করতে থাকলাম তখন দেখলাম একটা মিসিং লিংক রয়ে গেছে আমাদেরএই দেখো বৈষ্ণব সাহিত্যের পরপরই সরাসরি আমাদের আধুনিক সাহিত্যের অধ্যায় শুরু। মাঝখানে একটা বড় ফেজ রয়ে গেছে। পূর্ববঙ্গে একটা সাহিত্যের রীতি ছিল- ওরাল লিটারেচার এর মধ্যে নানা ফর্ম ছিল, যেমন- পুঁথি পাঠ, পালা গান, কিংবা বিভিন্ন রকম নাটক। তুমি জানো যে বুদ্ধ নাটকের ইতিহাস হাজার বছর আগের। এই লিটারেরি ট্রেন্ডটা অনেক বছর, আনুমানিক ১১০০ সাল থেকে প্রায় ১৭০০/১৮০০ সাল, এই লম্বা সময়ে পর্যন্ত টিকে ছিল। সাধারণত ব্রাত্যজন, যারা সমাজের সাধারণ ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ যারা কুলীন না তাদের যেহেতু লিখিত সাহিত্যের সাথে যুক্ততা ছিল না, তারা এই মৌখিক সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে তাদের লিটারেরি কোয়েস্টটা মিট করতো। এই সাহিত্য রীতিটা বহু বছর মানুষের পাঠের আড়ালে ছিল যেহেতু এটা মৌখিক সাহিত্য। ফলে আমাদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যে এইটা আমাদের অবহেলিত, অনালোকিত লিটারেরি ফর্ম, যেটা আসলে কখনই খুব একটা সমাদর পায়নি। আরেকটা বিষয় হলো- আমাদের যে ‘লিটারেরি হেরিটেজ’, এই বিষয়টার সাথে কানেক্ট করার চেষ্টা। যেমন ধরো হোমার এর ইলিয়ড ওডিসি নিয়ে এরিস্টটল তার ‘পোয়েটিক্স’ এ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন ঐটার লিটারেরি ফর্ম, লিটারেরি এলিমেন্টস নিয়ে। ওরা যেভাবে ওদের এপিকাল লিটারেরি ইলেমেন্টসকে ওদের কাজে যুক্ত করতে পারছে, এমনকি রেনেসাঁর সময়েও গেটে যেভাবে ফাউস্টকে রি-জেনারেট করছে, আমাদের দেশে কিন্তু আমাদের নিজস্ব মিথ, নিজস্ব কালচারাল হেরিটেজ এইগুলা নিয়ে ছবিতে ডিল করার আমরা খুব একটা চর্চা পাই নাই। জহির রায়হান বহু আগে ‘বেহুলা’ করছে বা আরও আগে ‘রূপবান’ হইছে, বা ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ খুব সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক ধারায় হইছে। এগুলা বাদে খুব একটা সমাদর পায়নি এইসব লিটারেরি হেরিটেজগুলা। কেন এইগুলা গুরুত্বপূর্ণ ছিল? যেভাবে মানুষের আদিম অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি এইসব সাহিত্যে এসেছে... মৈমনসিংহ গীতিকার কথায় যদি সরাসরি আসি, মৈমনসিংহ গীতিকায় এমন কিছু ইন্টারেস্টিং এলিমেন্ট এর ব্যবহার আছে, যেমন ধরো ম্যাজিক রিয়ালিজম, যেমন ধরো নারী প্রধান চরিত্র, আবার সমাজের প্রগ্রেসিভ ব্যাপারগুলো অনেকখানি ছিল, ৮-১০টা পালাগানে দেখা যাবে নারীরা প্রধান চরিত্র। এবং তারা অনেক বয়সকালে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতেছে, নিজেরা পাত্র পছন্দ করতেছে। আর লিটারেরি ট্রেন্ডের যে আরেকটা ব্যবহার থাকে যে মানুষের সম্পর্ক নির্ভর করে বিভিন্ন রকম চরিত্রায়ন। মানুষ কে কিভাবে রিএক্ট করতেছে, সেখানে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতেছে, পাখি চিঠি বিলি করতেছে, একেবারে মার্কেজীয় একটা ওয়ার্ল্ডও আছে কিন্তু এর মধ্যে...


রুদ্র কাওসারঃ কিংবা মানুষ সাপ হয়ে যাচ্ছে...

এন রাশেদ চৌধুরীঃ হ্যা, কিংবা সাপ সম্পর্কে যেসব মিথ আছে। যেহেতু এটা পানি বাহিত অঞ্চল এই কারণে এখানে মনসা ইজ মোর এডর্নড এজ আ গডেস। মনসা কিন্তু শিবের চেয়েও বড় এখানেএবং যেহেতু ব্রাত্যজন অধ্যুষিত এলাকা, ফলে এখানে দুর্গা বা অন্যান্য দেব দেবীদের ইনফ্লুয়েন্স কম, বরং শিবের কন্যা যেমন মনসা তেমনি মনসার পিতা হিসেবে শিবও পূজিত হচ্ছে। ফলে এই যে আদিম কন্ডিশনটা এবং এর মধ্যে বুদ্ধিস্ট ইলেমেন্ট এর ব্লেন্ড হইছেএগুলা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হইছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা যদি আমাদের হেরিটেজের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারি তাহলে নিজেদের আরেকটু স্ট্রেনথেন ফিল করতে পারি, যেই শক্তি দিয়ে আমরা আসলে একটা সাহস সঞ্চয় করতে পারবো। বহু সাহিত্যে ঘটছে এমন। গ্রিক লিটারেচারে দেখো, পরবর্তীতে ইটালির লিটারেচারে দেখো ডমিনেন্ট হইছে গ্রেট মাইথোলজি দিয়াপেইন্টিং এ আসছে, নাটকে আসছে, সিনেমাতে আসছে। শেক্সপীয়রের নাটকে যেমন। মিথ এর সাথে যোগাযোগ করে এরা যে শক্তিশালী সাহিত্যরীতি রচনা করলো এই ট্রেন্ডটাকে আমরা আসলে ভুলে গেছি। My motive was why not we look back to our heritage condition

এই যে আমরা ঋত্বিক ঘটক এবং মেলোড্রামা বলে এত যে চিৎকার চেঁচামেচি করি আমরা কিন্তু জানার চেষ্টাই করি না যে এইটার সূত্র কোথায়। এটা যে এই রিজিয়ন এর একটা অঙ্গাঅঙ্গি ফর্ম আমাদের এক্সপ্রেশন আমাদের একশন প্যাটার্ন এইগুলার মধ্যেই মেলোড্রামার অনেক ইলেমেন্ট আছে। যেইগুলা আমি চাইলেই অস্বীকার করতে পারবোনা। এইসমস্ত জিনিস থেকে আমরা আসলে ডিসকানেক্টেড হয়ে গেছি। সে কারণেই আই ওয়ান্টেড টু কানেক্ট উইথ আওয়ার অউন হেরিটেজ কন্ডিশন। এখন এইটা নো ম্যাটার হোয়াট রিলিজিয়াস মেটাফোর ওয়াজ এক্সিস্টেড দ্যাট পিরিয়ড। রিলিজিয়াস মেটাফোর কিন্তু একক কোন বিষয় না। এইটা একটা চেঞ্জিং কন্ডিশন। একসময় বুদ্ধিস্টরা ছিল আবার ব্রাক্ষ্মণরা আসছে, আবার বুদ্ধিস্টরা আসছে আবার ব্রাক্ষ্মণরা। আমি কাজটা করতে গিয়ে গবেষণা করতেছিলাম এই সমসাময়িক কালে আর কি কি ঘটনা ঘটছিলো আশাপাশে। আমাদের বিক্রমপুরেরই অনেক বড় একটা বুদ্ধিস্ট জনগোষ্ঠী আসামে চলে গেছিলো এই সময়। রাজপাট ধর্মপাট বলে একটা উপন্যাস আছে অভিজিত সেনের, যখন চৈতন্যদেব এই অঞ্চলে মানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসছিলো সেই ট্রাভেলটরিকে দেখাইছিলো সে। এর ঠিক ১০০-১৫০ বছর পরেই চন্দ্রাবতীর সময় অনেকে ধরে ১৫৮৫ থেকে ১৬৫০ পর্যন্ত। আসলে আমার উদ্দেশ্য শুধু চন্দ্রাবতী ছিল না, আমার একটা টাইমের মেটাফোর দরকার ছিল, এই টাইমটাকে ঘিরে আমাদের সামগ্রিক আবর্তনটা কেমন ছিল। এখানকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় কি ধরনের লোকজন ছিল, তারা কি এই দেশীয় নাকি বিদেশীয়। যেমন তুমি জানো যে ময়মনসিংহ গীতিকার ঐ অঞ্চলে দেওয়ানী শাসন ছিল, হাছন রাজা পর্যন্ত দেখি দেওয়ান বংশ রাজত্ব করতেছে এই অঞ্চলে। এবং এইদিকে ছোট ছোট জমিদার প্রথা ছিল এবং এই জমিদারদের করাঞ্চল ছিল এই দেওয়ানরা। দেওয়ানরা ছিল মুসলমান আর দেওয়ানরা যে কখনও জোর করে ধর্মান্তরিত করছে এমনটা জানা যায় না। সুতরাং এই অঞ্চলের মানুষজন নিজেরা নিজেদের মনসা-শিব নিয়েই কাটাতো এবং এই সাহিত্যিক চর্চাটাও তাদের আধ্যাত্মিক জনজীবনেরই অংশ। অর্থাৎ আমি যদি কালেকটিভ আনকনশাসের জায়গা থেকে এই জিনিসটাকে কানেক্ট করার চেষ্টা করি, অর্থাৎ আমার যে জন্মপ্রবাহিত সূত্র সেটা তো আমার মধ্যে বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত। তো আমি চাইলেই এটাকে কাট অফ করে দিতে পারি না। তো সেই জায়গা থেকেই মূলত আমার এই ফিরে দেখার চেষ্টা যে ফ্রম হোয়ায় উই আর হেয়ার নাউ। আর ঐ যে বিভিন্ন ইলেমেন্টের ব্যবহার দ্যাট অরিজিনাটিং ফ্রম আওয়ার অউন ল্যান্ড টেরিটোরি। তুমি যদি নবরসকে একটা ভারতবর্ষীয় নাট্যানুসঙ্গ ধরো, আমাদের এখানেও এই ফর্মগুলার মধ্যে আমাদের নিজস্ব এক্সপ্রেশনের প্রকাশভঙ্গি আছে। তো আমি দেখলাম যে সেই প্রকাশভঙ্গিকে সিনেমাতে ব্যবহারের সুযোগ আছে সেই উদ্দেশ্য থেকেই ‘চন্দ্রবতী কথা’ করতে আসা। আর জেনারেশনের মধ্যে একটা যোগ ঘটানো ছিল আমার একটা পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্য।

রুদ্র কাওসারঃ এই যে আপনি বলছেন একটা শক্তির উৎস খোঁজার চেষ্টা যা বিভিন্ন দেশের ইতিহাসেই দেখা যায়, সেটা তো আসলে আমাদের স্বকীয়তা খোঁজারই চেষ্টা। আপনি যেমন বলছেন পালাগানের কথা তেমনি শুধু মধ্যযুগের সাহিত্যই তো নয়, অন্যান্য নানা ফর্মেরও তো আলাপ আছে। আমাদের সিনেমার নিজস্ব ভাষা নির্মাণে এই সাংষ্কৃতিক রুট কে নিয়ে পড়াশোনা আপনার কাছে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়? মানে পাঠের গুরুত্ব কতখানি?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ দেখো আমরা যারা সিনেমার সাথে যুক্ত আছি তাদের মধ্যে ম্যাচুরলি ফিল্মমেকিং এ আছে তাদের জন্য... ধরো একজন গল্পকার গল্প যে লেখে, ঔপন্যাসিক উপন্যাস যে লেখে, তার মধ্যে যে একটা কোয়েস্ট আছে, আমি মনে করি যে ফিল্মটা আসলে লিটারেচারের মতোই একটা বিষয়। তুমি যদি সাধনায় ব্রতী না হয় তাহলে আসলে খুব একটা উত্তরণ হবে না। মানে তুমি একের পর এক কাজ করতে পারবা, কিন্তু তোমার নিজস্বতা আসবে না। বা আমার এই নিজস্বতা একটা সময়ে গিয়ে একটা সামগ্রিক নিজস্বতার কন্ডিশনকে কানেক্ট করবে। এই নিজস্বতা কিন্তু একটা দেশীয় নিজস্বতার জায়গা তৈরী করে। যেমন ইরানে আমরা দেখছি- আব্বাস কিয়ারোস্তামির আগে কি সিনেমা ছিল না ইরানে? ছিল। সেগুলাতে কি ইরানের জনজীবন বা ভাষাভঙ্গির প্রকাশ নাই? আছে। কিন্তু আব্বাস কিয়ারোস্তামি সেই জায়গাটাকে একটা ফার্ম সেটেলমেন্টে পৌঁছায় দিছে। ইরানি হেরিটেজ, ইরানি সুফিজম, ইরানি মেটাফোর কতটা সাটলিটি বেইজ করে তাদের কন্ডিশনে বেজড করে, সেটার সাথে জনজীবনের একটা স্বাভাবিকতা যুক্ত, আমি যদি তার চরিত্রগুলোর কথা মনে করি- তাদের যে আচরণ বা ব্যবহার এগুলার সাথে খুব বেশি করে একটা সাবমিসিভ কন্ডিশন অব দ্য ইস্ট আছে। এইটা তো ইরানি সিনেমার ভাষাভঙ্গিতে কন্ট্রিবিউট করছে, তাই না? আবার আব্বাস কিয়ারোস্তামি এট দ্য সেইম টাইম লুক ফরোয়ার্ড টু হিজ ল্যাঙ্গুয়েস্টিক মেটাফোর অব হিজ অউন ওয়ার্ল্ড। সে নিজেও যখন তার কাজ করে যাচ্ছে একের পর এক তখনও এটাকে খুঁজে পাওয়ার একটা চেষ্টা আছে। আমিও মনে করি এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমি নিজেও আমার পূর্বতন কাজগুলোর মধ্যে ভাষাভাঙ্গির অনুষঙ্গগুলা যেমন ন্যারেটিভিটি, আমি যে গল্প নিয়ে ডিল করতেছি সেই গল্পের টাইম কি, সেই গল্পের মেটাফোর কি, সেই গল্পের বৃহত্তর গল্প কি বা পলিটিক্যাল এক্সটেনশন কি এই জিনিসগুলা তো ভাষাভঙ্গির অন্যতম অনুষঙ্গ, তার সাথে আছে সিনেমার ফর্ম- ক্যামেরার পজিশনিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন টেকনোলজিক্যাল ফর্মের যে ইউজ, সেই সাথে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, প্লেইন ল্যান্ডের পয়েন্ট অব ভিউয়ের সিমিলারিটি বা হোয়াট আদার রিলেশন ইজ দেয়ার সেই জিনিসটাকে খুঁজে দেখার চেষ্টা করা। এইটাকে তো একটা সার্চ থাকেই, এবং সেই সার্চ খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ সার্চও বটে। আসলে তুমি ঠিকই বলছো। ঐ অনুষঙ্গটা আমাদের সিনেমায় একটা প্র্যাক্টিসের জায়গা ছিল। আমরা কিভাবে নিজস্ব ভাষাভঙ্গির দিকে ফারদার ফরোয়ার্ড করতে পারি। আমি তো ধরো খুব একটা সারটেইন না। আমাদের ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি, ওয়েস্টার্ন এসথেটিক্স এমনভাবে আমাদেরকে ডমিনেট করে, বিশেষ করে সিনেমার মতো মিডিয়ামে হুইচ ইজ ডিরেক্টলি ফ্রম দ্য ওয়েস্টার্ন মিডিয়াম। সেই সমস্ত জায়গায় আসলে ইনস্ট্রুমেন্টের ব্যবহারের মধ্য দিয়েই আসলে ফর্মের একটা রিলেশনশিপ আছে। সেই জায়গায় আমরা কতটা আমাদের নিজস্বতা আরোপ করতে পারি এইটা তো অবশ্যই একজন ফিল্মমেকারের সার্চ। তো সেই সার্চের জায়গাটা আমার মধ্যে ছিল ডেফিনিটলি। সেটা যেমন গল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে ছিল, ন্যারেটিভিটি ডিল করার ক্ষেত্রে ছিল, ল্যাঙ্গুয়েস্টিক ফর্ম কনস্ট্রাকশনের দিক দিয়ে ছিল, কস্টিউম এন্ড হোয়াটএভার রিয়েলিস্টিক ইলেমেন্ট কুড হ্যাভ বিন এগজিস্টেড এট দ্যাট টাইম, মিনিমাল লেভেল হইলেও সেইটা খুঁজে বের করে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টার মাধ্যমে সময়টাকে ডিল করা, এগুলার মধ্যেও ছিল সেগুলো অবশ্যই একটা সার্চ হোয়াইল মেকিং দিস ফিল্ম।

রুদ্র কাওসারঃ আপনার পূর্ববর্তী নির্মাতাদের মধ্যে ঠিক এই জায়গায় কাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়? আমি শুধু শৈল্পিক চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা বলছি না। এদের মধ্যে কাকে আপনার মনে হয় এই নিজস্ব ভাষা নির্মাণের তাগিদে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ এর আগে যারা কাজ করছে হয়ত একটা মুক্তিযুদ্ধের গল্পই করছে কিন্তু ডিফারেন্ট পারস্পেক্টিভ কিংবা একদম একটা সাধারণ ঘটনা জীবনের, যে এক দম্পতির একটা মিটিং, মাত্র ৫ মিনিটের একটা শর্ট ফিল্ম ‘সে’। এইটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া প্রথমত। দ্বিতীয়ত এইটা যখন রেজিস্টার করে, ধরো আমি সত্যজিত রায়ের এতগুলা ফিল্ম দেখার পরে এখন বুঝতে পারি যে সত্যজিত রায় একটা নির্দিষ্ট ভাষাভঙ্গি অর্জন করতে চাইছে। সিনেমাতে সে বিশেষ কিছু ফর্ম ও ইলেমেন্টের ব্যবহারের মাধ্যমে, ন্যারেটিভিটি বা পার্টিকুলার এঙ্গেল ডিল করার মাধ্যমে তিনি একটা ভাষাভঙ্গি এচিভ করতে চাইছে। সেটা তার জীবদ্দশায় অনেকগুলা কাজ দেখলে আমরা একটা ধারণায় পৌঁছাতে পারি। বা দেখো ঋত্বিক ঘটকের আরেক রকম ট্রীটমেন্ট, সেটা থেকে ইনফ্লুয়েন্স হয়ে যখন আরও ৭-৮ জন ফিল্মমেকাররা কাজ করে, এবং এখন পর্যন্ত এক্সিস্ট করতেছে অন্ততপক্ষে ৩ জন ফিল্মমেকার ভারতবর্ষে, এবং এরা যারা মণি কাউল বা কুমার সাহানির অনুসারী, তবুও আদতে আলটিমেটলি তারা ঋত্বিক ঘটকেরই অনুসারী, একই পরম্পরার অংশ। তো আমি এইভাবে জিনিসটাকে দেখি যে আমাদের এখানে আমরা আসলে একটা ন্যারেটিভিটি ডিল করতে বেশি চিন্তিত ছিলাম। হোয়েন উই ওয়ার রিয়েলি এবাউট টু সাকসেসফুলি ডিল সাম স্টোরি ইন ন্যারেটিভ ম্যানার সেইটাকে আমরা সাধারণত মনে করে আসছি সাকসেস কন্ডিশন হিসাবে। যেমন মোরশেদুল ইসলাম দুই ভাইয়ের গল্প নিয়ে একটা সিনেমা বানিয়েছেন। তার ঐ গল্পটাকে সুপারসিভ করতে যাওয়ার চেয়েও বা এটাকে সিনেমা মিডিয়ামে ট্রান্সফর্ম করতে যাওয়ার চেয়েও সে গল্পটাকে এডাপ্ট করতে পারলো কিনা সিনেমাতে সেইদিকে আগ্রহ বেশি ছিল। যদিও ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক ঐভাবে ইভলভ করে না যে আমি জেনে বুঝে ফর্মগুলা এপ্লাই করতেছি এবং সেটা সাকসেসফুলি ঘটে যাচ্ছে। এরকমভাবে এটা ওয়ার্ক করে না। মোরশেদুল ইসলাম কাজ করার সময় সে যেমন ন্যারেটিভ প্যাটার্ন সিলেক্ট করছে তার গল্পগুলাতে সেইগুলা তার একটা ভিন্ন ভাষাভঙ্গি। আমি এটা বলছি না যে ভাষাভঙ্গির কোন প্রভাবক দিক নাই তার ছবিতে। আবার তুমি যে বিশেষত্বের জায়গা বলতেছো যে কে রিয়েলি এই জায়গাটাকে এটেইন/এটেম্পট করছে সেইটা হয়ত সাকসেসফুল নাও হইতে পারে লং রানে, কিন্তু এটেম্পটা ছিল সেক্ষেত্রে আমি মনে করি আবু সাইয়ীদের কাজের মধ্যে এটা আছে। তারেক মাসুদের কাজেও ছিল, যদিও অনেকে বলে যে সাবজেক্টিভির জায়গা থেকে সেগুলো অনেক বেশি ডিডেন্ড হয়ে উঠছিলো। কিন্তু তার ফর্মের ক্ষেত্রে মানুষের জনজীবনের এক্টিভিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিললো। যেমন ‘আদম সুরত’ এর কথা যদি বলি সেখানে যেভাবে আছে। কিন্তু পরবর্তীতে তারেক মাসুদ সেখান থেকে সরে গিয়ে সে আসলে ন্যারেটিভ কন্ডিশনের দিকে বেশি ঝুঁকে গেছিলো। এইটা আমি মনে করি যে তার ঐ কারেন্টকে(!৩- ৫.১৭) একটু ইন্টারাপ্টই করছে। সেদিক থেকে আবু সাইয়ীদ যেহেতু বেশি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছিল সে জিনিসটাকে অনেকদিন পর্যন্ত এক্সটেন্ড করতে পারছে। কীত্তনখোলায় দেখো একটা অন্যরকম নাইভিটি এবং টাইম এর এসেন্সকে টাচ করতেছে। এটা আসলে ওভার দ্য টাইমে ঘটে, কিন্তু ফিল্মমেকারের এপ্রোচের জায়গা তো আছেই। একজন সাহিত্যিক তার নিজের ভাষা খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং সেইটাকে এচিভ করার চেষ্টা করতেছে তার কাজে সেই একইভাবে একজন ফিল্মমেকারও করে। ঋত্বিক ঘটকের ফলোয়ারদের দেখো তারা কিভাবে ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজকে নিজেদের কাজে ডিল করছে ইউনিকলি এবং ডিফারেন্টলি এবং নিজস্ব ভাষাভঙ্গি তৈরী করছে। এই এপ্রোচটা একজন ফিল্মমেকারের নিজস্ব এপ্রোচ যদি সে চায় এই ভাষাভঙ্গি নিয়ে ডিল করবে এবং একের পর এক কাজে এপ্লাই করে তখন আসলে একটা সিগনিফিকেন্ট জায়গায় পৌঁছায়। সেই জায়গা থেকে এখানে আমরা যেহেতু খুব একটা কুইকার ইন্টারভেলে কাজ করার সুযোগ পাই না সার্বিক বাস্তবতায়, এবং কতটা ইন্ডিপেন্ডেন্টলি হ্যান্ডেল করতে পারবো সেইটারও নিশ্চয়তা খুবই কম। তো তুমি যেই প্রশ্নটা করলে এই সার্চটা আমরা খুব একটা ফিল্মমেকারের মধ্যে পাই না। আমরা দেখতে পাই যে সেই ওয়েস্টার্ন এসথেটিক্স এর জায়গা থেকেই আমাদের সিনেমাকে ডিল করার চেষ্টা করা হচ্ছে

রুদ্র কাওসারঃ কিন্তু আপনার কাছে কি মনে হয়- সিনেমার ভাষাটাই বা মূলত কি? এটা কি শুধুই ন্যারেটিভিটি নাকি টাইম এন্ড স্পেসের যে সংযুক্তিকরণ তার মধ্য দিয়ে নিজস্ব অনুভূতিকে উপস্থাপন করা?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ যখনই আমি ঋত্বিকের সিনেমা দেখি বা ওজুর সিনেমার দেখি আমি ভেবে দেখলাম তাহলে ইলেমেন্টগুলা কি আমরা ডিটেক্ট করতে পারি যে এদের ছবি কেন আলাদা? বেশিরভাগ ছবিতেই ঐ সেইম পয়েন্ট অব ভিউ থেকে শ্যুট করা, লো এঙ্গেল, ৫০ লেন্সের আধিক্য, অলমোস্ট নো মুভমেন্ট অর লেস মুভমেন্ট অফ ক্যামেরা, হোয়াইল মিনিমালিস্ট ইউজ অব স্পেস এন্ড মেটাফোর, ক্যারেক্টারস আর সাটল এন্ড সিম্পলি টকিং। খুব সাধারণ ঘটনা ঘটতেছে তাদের জীবনে কিন্তু ঐটাই আসলে সিনেমার গল্প। কিন্তু এইটার পিছনে একটা সমাজ বাস্তবতা আছে। ঐগুলা সবই কিন্তু কনটেম্পরারি সময়ের কাহিনী, সেই সময়ের জাপানের সোসাইটির সাটল চেঞ্জগুলা যা ওজু দেখছে সেগুলাই কিন্তু ও সিনেমায় আনার চেষ্টা করছে। বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানে ফ্যামিলি লাইফ কেমন ছিল, সেখানের সাধারণ ছোট ছোট ঘটনা, ছেলের জন্য মায়ের স্যাক্রিফাইস, বা একটা যাত্রাদল যাত্রা করতে যাচ্ছে তাদের ক্ষয়িষ্ণু কন্ডিশন, আবার যুদ্ধের পরে এসেও সোসাইটির সাটল এবং সিম্পল চেঞ্জেসগুলাকে ওর সিনেমায় আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করতেছে। যেমন একটা যুদ্ধ থেকে কিভাবে আলাদা হয়ে যাচ্ছে সোসাইটি। ব্যস্ত সময়ের মধ্যে চলে যাচ্ছে, প্রত্যেকেই জাপান গড়ার সংগ্রামে লিপ্ত। এখানে বৃদ্ধরা আর আউটফ্রম ফ্রম মেইনস্ট্রিম অফ দ্য সোসাইটি, বাট দে হ্যাভ আ স্ট্রং ভিউ, তারা যেভাবে নিজেদের স্পিরিচুয়ালিটিকে দেখতেছে। মেয়ের বিচ্ছেদে বাবা ভাবতেছে এইটাই তো জীবন। তোমার মতো তুমি চলবা, আমার জীবন এইভাবেই কাটবে। এবং একটা আপেলের খোসা ছাড়ানোর মতো করে জীবন একটা পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। ইট ইজ আ কমপ্লেক্স অফ সাইকেল অফ লাইফ।

তাহলে এখানে অজুর ভাষাভঙ্গিটা আমরা কিভাবে আলাদা করবো? প্রথমত সে জাপানিজ, তাদের ন্যারেটিভিটির তার ভাষাভঙ্গি এগজিস্ট করে। এই ন্যারেটিভিটির মধ্যে ধরো আরও পাঁচটা এলিমেন্ট আছে। চরিত্র কারা? তাদের সময়টা কি? এই গল্পের বাইরে কি অন্য আরেকটা গল্প আছে যেটা আমরা দেখি না কিন্তু এই গল্পের মধ্যেই সেটা এগজিস্ট করে? দ্য জাপান দ্যট ওয়াজ সো ফিউরোশাস বিফোর দ্য ওয়ার, দ্যট বিক্যাম ভেরি ভালনারেবল আফটার দ্য ওয়ার। তো এই যে গ্রেটার জাপান এই জাপানকে কিন্তু আমরা দেখি না কিন্তু অনুভব করতে পারি অজুর সিনেমার মধ্যে। অর্থাৎ ন্যারেটিভিটির মধ্যে অনেক কিছু আছে। যেমন গল্পের একটা স্বাভাবিক প্রগেসন আছে আবার একটা গ্রেটার কন্ডিশন আছে যেটা আমরা দেখি না সরাসরি কিন্তু যেটা এগজিস্ট করে। যেটাকে তুমি সময় বলতেছো বা সময়ের মেটাফোর বলতেছো। তার পূর্বতন সময় / ইতিহাস থেকেই তো এদের ভাবনার জগত তৈরী হইছে। এইগুলা হচ্ছে ন্যারেটিভিটির অংশ। আর ধরো ইনটেনশনাল ইউজ অফ ভেরিয়াস টেকনিক্যালিটি। যেমন সিনেমাটিক এঙ্গেল, যেহেতু কাতানের উপর বসেই ওরা বেশিরভাগ সময় কথাবার্তা বলে, খাবার খায় অথবা ধ্যান করে ইত্যাদি। কিন্তু ওর আগে এইটাকে কেউ ভাবেনি। অজু ওর সিনেমাটিক এলিমেন্ট হিসেবে এইটাকে (ক্যামেরা এঙ্গেল) এস্টাব্লিশড করতেছে এবং এইটা অজুর ভাষাভঙ্গি হিসেবে কন্ট্রিবিউট করছে, আ নিউ ফর্ম ইমার্জড ইন সিনেমাআমরা যেহেতু প্লেইন ল্যান্ডের অধিবাসী, ঋত্বিকের ক্ষেত্রেও দেখছি যে ৫০ লেন্স, ওয়াইডার লেন্সের ব্যবহার অনেক বেশি। আমরা যেহেতু সমতলের বাসিন্দা আমাদের পয়েন্ট অফ ভিউটা বিস্তৃত। ওয়াইড এঙ্গলের ব্যবহার যেমন আমরা দিগন্তজোড়া দেখি ঋত্বিকের ক্যারেক্টাররা এগেইনেস্ট দ্য হরাইজন। এই টেকনিক্যাল এলিমেন্টের ইউজ বা লাইটিং এর ক্ষেত্রে, যে সূর্য এবং ঘরের আলো এইগুলার যে ব্যবহার এবং পোশাক নির্বাচনে। ঐ জনগোষ্ঠী, যাদের গল্প‌ তাদের পোশাক ঠিক আছে কিনা। আসলে আমরা সিনেমা করার সময় একটা ড্রেস কোড হয়ত ফলো করি। কিন্তু জেনারেলি এইটার এন্থ্রোপলজিক্যাল ট্রুথকে আইডেন্টিফাই করতে অতটা এফোর্ট দেই না। যেমন আমার সিনেমায় আমরা কতটুকু পারছি না, তবুও ঐ কাপড়গুলা ওয়েদারিং করা হইছে ৬ মাস ধইরা, তারপরে এইগুলা বানানো হইছে হ্যান্ডলুম তাঁতে। আমরা খুব কম জিনিসের এরেঞ্জমেন্ট করছি কিন্তু সেইগুলা খুব এসেনশিয়াল জিনিসপত্র। যেমন পোশাক, যেমন অর্নামেন্টস, যেমন বিভিন্ন রকম প্রপস। এইগুলার সমসাময়িকতা আমি মনে করি যে ভাষাভঙ্গিতে কন্ট্রিবিউট করে। আমার কাছে সিনেমা ভাষাটা এরকম যে যেহেতু তুমি একটা টাইম এবং স্পেসের গল্প বলতেছো সেই জায়গায় এলিমেন্টের ব্যবহার তুমি কতটা যুক্তিযুক্ত করে তুলতেছো এবং নিজস্বতা এপ্লাই করতে পারতেছো, তোমার নিজস্ব কোন পয়েন্ট অফ ভিউ দ্যট ইউ হ্যাভ বিন এবল টু কানেক্ট টু ইট, সেই জায়গা থেকে এইগুলা ওয়ার্ক করে ভাষাভঙ্গিতে কন্ট্রিবিউট করে। তারপরে ধরো আমি পাঁচটা কাজ করতে পারলে আর সেইগুলাতে আমি যদি সাকসেসফুলি এলিমেন্টগুলা ব্যবহার করতে পারি তখন এই ভাষাভঙ্গি একটা এস্টাব্লিশিং কন্ডিশনে আসে। ও একটা পার্টিকুলার পয়েন্ট অফ ভিউ এপ্লাই করছে এবাউট দ্য লিঙ্গুয়িস্টিক অফ দ্য ফিল্ম। এইটা আসলে একটা-দুইটা কাজ করে হয় না। এইটা একটা দীর্ঘ সাধনার মতো বিষয়।


রুদ্র কাওসারঃ তার মানে হচ্ছে এই ওজুর ক্ষেত্রে যেমন ক্যামেরা এঙ্গেল থেকে শুরু করে মদের একটা বোতল প্লেসমেন্ট পর্যন্ত আমাকে আমার নিজস্ব জনগোষ্ঠীর প্রতি ট্রুথফুলনেস রাখা।

এন রাশেদ চৌধুরীঃ হ্যা, সেটাই। দেখো যেভাবে মোরসেদ ভাই দশটা সিনেমা করছে। সেই দশটা সিনেমায় সে যেভাবে ন্যারেটিভ স্টোরিকে ডিল করছে এটা আমার কাছে অগুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে এজ আই মে বি এডভান্সড ইন মাই স্টাডিজ, আমার কাছে সোশ্যাল পারস্পেক্টিভ ইজ ডিফারেন্ট। আই ক্যান কন্ট্রিবিউট এজ আ প্রটেস্ট এলিমেন্ট ইন বাংলাদেশ রাইট নাউ। এখানে ইসলাম ধর্ম আসছে মাত্র ৮০০ বছর আগে। এরকম অনেকে আছে যারা মোরশেদুল ইসলামের কাজকে গুরুত্ব দিবে না, আমিও দেইনি এক সময়। কিন্তু এমন একটা সময়ে এসে আমি যখন লুক ব্যাক করতেছি, আমি মোরশেদ ভাইয়ের ইন্টারভিউ করার সময় সেও একই কথা বললো জানো? আমি মোরশেদ ভাইকে বলতেছিলাম আপনার ন্যারেটিভিটি অফ স্টোরি দেখে মনে হয় আপনার পার্টিকুলার একটা সার্চ ছিল এবাউট সিলেকশন অফ স্টোরি। সে বললো যে হ্যা তুমি ঠিকই বলছো, আমি যখনই কোন সিনেমা করতে গেছি আমার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ গল্প এবং সেটা আমার জীবনে যেভাবে প্রভাব ফেলছে সেই জায়গাটায় আমি নিজে কানেক্ট করার চেষ্টা করছি গল্পের সাথে‘আমার বন্ধু রাশেদ’ এ ধরো- বয়সকালে ছেলেকে নিয়ে গল্প করতে করতে ঐ যুদ্ধের জায়গাতে তারা যায়। আমরা কুমার সাহানির পাঁচটা সিনেমা যদি দেখি (আমি শুধু বলে যাচ্ছে ব্যাখ্যার জন্য, সবকিছুই সাক্ষাতকারের জন্য নট নেসেসারি) তাহলে দেখবো যে ওর ধীর লয়ের ক্যারেক্টার প্রগ্রেসন, তাদের ঘটনার তাড়াহুড়া নাই, সাটলিটি অফ কন্ডিশন, খুব সাটল একটা কন্ডিশন দিয়ে একটা বড় গল্প বলার চেষ্টা। একটা হাত দেখতেছি, আরেকটা হাত সেটাকে ছুতে যাচ্ছে, ওর মধ্য দিয়েই একটা মেটাফোরের জন্ম হচ্ছে। একটা চিঠি কেউ পড়তেছে সেই চিঠির অপোজিট ক্যারেক্টারকে আমরা দেখতেছিনা, কিন্তু ঐ ক্যারেক্টারটা সম্পর্কে একটা ইল্যুশন আমার মধ্যে কাজ করতেছে। এইভাবে মণি কাউল আরেকভাবে জিনিসগুলাকে করছে। দেখো ঋত্বিক ঘটক তাদের গুরু, আমি কাছ থেকে দেখেছি এখন পর্যন্ত তারা ঋত্বিক ঘটকের নাম শুনলে মাটিতে পড়ে যায়, ঋত্বিকের বোনের কাছে নিয়ে গেলাম তার পায়ের উপর শুয়ে পড়লো, তো তাদের গুরুভক্তি দেখে আমি একটু বোঝার চেষ্টা করলাম কি কারণে ঋত্বিক তাদের এত প্রিয়। তাদের কাজে ঋত্বিকের ডিরেক্ট ইনফ্লুয়েন্স সেইভাবে নাই; ক্যামেরা এঙ্গেল, মেলোড্রামাটিক এপ্রোচ – এই জিনিসগুলা অন্যভাবে নিজেদের মতো করে আছে ন্যাচারালি। তো তাদের দুই-একটা লেখা পড়লে দেখবা যে কুমার সাহানি বলতেছে ঋত্বিক তাকে প্রথম অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে নিয়ে যায় এবং সরাসরি তার কাছে সেতার শিখছে কয়েকদিন কুমার সাহানি তারপরে সেই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মার্ক্সিস্ট ডি ডি কসাম্বির কাছে মণি কাউল-কুমার সাহানিদের নিয়ে গেছে ঋত্বিক একজন ফিল্মমেকার তার ছাত্রদের নিয়ে যাচ্ছে ক্লাসিক্যাল মিউজিকের কোন গুরুর কাছে, আবার নিয়ে যাচ্ছে এরকম একজন হিস্টোরিয়ানের কাছে, আবার একদিন হয়ত কোন নাটক দেখতে যাচ্ছে। আমার কথা হচ্ছে এই যে ন্যারেটিভটির মধ্যে যে গ্রেটার কন্ডিশন এগজিস্ট করে, সেইটাই আসলে ভাষাভঙ্গিতেও কন্ট্রিবিউট করে। যে প্রশ্ন আসলো যে তাহলে কি সিনেমার গল্পের মধ্যেও কি ল্যাঙ্গুয়েস্টিক এলিমেন্ট থাকে? হ্যা থাকে, তবে গ্রেটার অর্থে। একটা সময়কে তো আমরা দেখি। আরেকটা সময়কে দেখি যে বৃহত্তর সময়ের আবর্তে এই সময়টা অবস্থিত। তারপরে একটা পার্টিকুলার টেরিটোরির অংশ এটা, যেটা আইদার জাপান অর বাংলাদেশ

রুদ্র কাওসারঃ কিংবা আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম।

এন রাশেদ চৌধুরীঃ হ্যা, পার্বত্য অঞ্চলের ফিল্মমেকারদের মধ্যে এই জিনিসটা আরও ক্লিয়ারলি ভিজিবল। অং এর কাজে দেখবা যে ওর একটা আলাদা ভাষাভঙ্গি তৈরী হইছে, কেন, কারণ দেখা যাবে যে গল্প কিভাবে কন্ট্রিবিউট করে ল্যাঙ্গুয়েজে। কুমার সাহানির ‘চার অধ্যায়’ এ যেমন বেঙ্গল এর চেয়েও মনে হয় মোর নন বেঙ্গলি পয়েন্ট অফ ভিউ। স্পেস, ল্যান্ড, টেরিটোরি, মিথ, তার গ্রেটার স্টোরি, তার হিস্টোরি এইগুলা সবগুলা নিয়েই তার ন্যারেটিভিটি। এই ন্যারেটিভিটির মধ্যে যদি ধারণ করা যায় তাহলে চলচ্চিত্র ভাষার একটা গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট এগজিস্ট করে আমি মনে করি। কিন্তু আমরা অনেক সময় রিজিড হয়ে যাই না যে আমি লং টেকই নিবো? আমার কাছে সময়ের ধারণা মোর রিয়েলিস্টিক মেটাফোর এচিভ করে। এই রিজিড ফিক্সেশনগুলা থেকে একটা ভিন্নতর ভাষাভঙ্গির ইঙ্গিত আমরা পাই। তাইলে অনেকগুলা এলিমেন্ট আছে, মিউজিক অফ কোর্স, মণি কাউল যখন ‘ধ্রুপদ’ বানাইছে সেইটা এক অঞ্চলের সঙ্গীত, যখন সে ‘দুভিধা’ বানাইছে তখন সেটা কমপ্লিটলি আরেক অঞ্চলের গান-সঙ্গীত। তুমি দেখো ঐ পার্টিকুলার সিনেমার ভাষাতে ঐ গানটা-মিউজিকটা কিভাবে কন্ট্রিবিউট করতেছে। আমাদের সিনেমাতে আমরা এই প্র্যাক্টিসটা করছি, আমি জানি না এটা সাকসেসফুলি হইছে কিনাঐ সময়টাকে মাথায় রেখে একতারা, দোতারা আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঐ তারেরই কিছু যন্ত্র যেগুলা দোতারার মতো করে বাজানো হইছে। মিউজিকগুলা তৈরী হচ্ছে ফ্রম দ্য ভেরি লিটারেরি ট্রেন্ড, যেমন পালাগানের সুর বা একটা পাচালির সুর, পয়ার ছন্দেএরকমভাবে মেটাফোর বা স্পেস থেকেই মিউজিকগুলা আসতেছে। আমার সিনেমায় তিনটা ডিফারেন্ট গল্প বলার চেষ্টা করছি তিনটা ডিফারেন্ট টাইমের, আমি অবশ্য সময়কে আলাদা করতে চাইনি, কেউ যদি আলাদা করে দেখতে চায় দেখতে পারে। এই তিনটা সময়ে আমি তিন রকম মিউজিক দিছি এবং যখনই ঐ টাইমে ফিরে আসে তখনই ঐ মিউজিকগুলার অনুষঙ্গও আসে। এভাবেই এলিমেন্ট ভাষাভঙ্গিতে প্রভাব রাখে। একজন সাহিত্যিক কি শব্দ-বাক্য ছোট করবে না বড় করবে, নাকি একটানে লিখে যাবে, নাকি বেশি অলংকার যুক্ত করবে নাকি অলংকারহীন স্বাভাবিকভাবে মানুষ যেভাবে কথা বলে সেভাবে লিখবে এর মধ্যে দিয়ে যেমন তার ভাষাভঙ্গি নিহিত। এখন চলচ্চিত্র নির্মাতা তার ভাষাভঙ্গিটা কতটা সাকসেসফুলি করতে পারলো এটাকে সময়ের আবর্তে দেখতে হবে।

রুদ্র কাওসারঃ আমাদের এখানে তো একটা আলাপ প্রচলিত আছে যে একইসাথে যদি সিনেমায় আর্ট এবং ব্যবসা দুইটাই করানো যায় তাহলে ভাল হত, ইন্ডাস্ট্রি টেকানো যেত...এইসব! এক ঢিলে দুই পাখি! তো আপনার কি মত- একজন স্বাধীন নির্মাতার পক্ষে ‘সকলের’ মনোপযোগী সিনেমা নির্মাণ সম্ভব কিনা বা তার দায় আছে কি?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ শোনো প্রশ্নই ওঠে না। এই ধরনের বিতর্কের কোন সুযোগই নাই। প্রথম কথা হচ্ছে সিনেমা এজ এন আর্ট ফর্ম ইফ ইউ কনসিডার, এখানে কমার্সের কোন যুক্ততা দেখি না। দ্বিতীয়ত, বহু ফিল্মমেকারের সিনেমা ফাইনেন্সিয়ালি সাকসেসফুল হইছে। কিন্তু তারা নিজে থেকে কক্ষনো কমার্শিয়াল এলিমেন্টের ব্যবহার করে না। তুমি গদারের সিনেমা দেখো। সে ব্রিজিত বারদতকে পর্যন্ত নিয়ে আসছে। ঐ সিনেমা ফিন্যান্সিয়ালিও সাকসেসফুল। এটা ঘটে যেতে পারে। কিন্তু একজন স্বাধীন নির্মাতা অন্তত আমি যতজনকে জানি তারা কেউ তাদের কাজে ব্যবসায়িক ভাবনার ন্যুনতম সুযোগই দিতো না। তারা পরিষ্কারভাবে এটাকে ডিনাই করছে। বলছে যে- উইথ কমার্শিয়ালিজম আই ডোন্ট হ্যাভ এনি রিলেশন। এজন্য দেখবা যে তারকোভস্কি পরের দিকে বার্গম্যানকে, আন্তোনিওনিকে এক ধরনের অবিশ্বাসের চোখে দেখার চেষ্টা করছে। বলছে যে- আন্তোনিওনি ভাল কিন্তু ইদানিং ও ভয় পায় মনে হয়। আবার মিজোগুচিকে প্রশংসা করতেছে যদিও মিজোগুচি ইন্ডাস্ট্রি থেকেই জন্ম নেয়া ফিল্মমেকার।

রুদ্র কাওসারঃ এবং মিজোগুচি তো প্রায় ৯০টা সিনেমা বানাইছে। হিউজ!

এন রাশেদ চৌধুরীঃ হ্যা। অজু, মিজোগুচি, কুরোসাওয়া, নারুসি প্রত্যেকেরই তো গড়ে প্রায় ৫০টা করে সিনেমা। এবং এরা একটা নির্দিষ্ট স্টুডিও বেজড ফিল্মমেকিং এর চক্র থেকে ছবি বানাইছে। কিন্তু তাদের ছবি কতটুকু চলছে? আমাদের ফিল্মমেকারদের মধ্যে জহির রায়হানের কিন্তু এরকম কোন প্রিটেনশন ছিলনা যে আমি সিনেমা করবো বলে কমার্সের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই। সেটাতো দেখাই যাচ্ছে, সে পাকিস্তানের ছবিও বানাইতে যাচ্ছে, গান রাখতেছে এন্টারটেইনিং ছবির মধ্যে। গান রাখতে পারে না তা না। কিন্তু আমি বলতেছি কনশাসলি ইমোশনকে জেনারেট করার ইচ্ছা থেকে গান রাখা। (এইগুলা আমি এমনিই উদাহরণ বলতেছি র‍্যান্ডমলি) আমি বলছি যে এইটা এখনও একসাথে ঘটতে পারবে না কারণ যখনই ফিল্মমেকার কমার্সের চিন্তা করবে তাকে কিন্তু তার আইডিয়া থেকে সরে এসে অন্য অনেক কিছুর উপর নির্ভর করতে হবে। অর্থাৎ তার স্বাধীন চিন্তা একটুখানি হইলেও ইন্টারাপ্টেড হইলো। ইদানিংকালে দেখা যায় কি অনেক ছবিতে আমরা পিচ করি। সেখানে প্রডিউসাররা তাদের নানা রকম ডিমান্ডের কথা বলে। দেখা যায় যে গল্পকেও তারা টার্ন করে ফেলতেছে। এখন ফিল্মমেকার এনাফ বাজেট পাচ্ছে বলে বানাইতে পারতেছে আর বাজেট পাচ্ছে না বলে বানাইতে পারতেছে না তাই বলে তোমাকে ঐসব বাহান্র উপর নির্ভর করতে হবে সেইটা আমি কোনভাবেই বিশ্বাস করি না। আমি ১০ বছর পর আবার একটা ছবি বানাইলাম কিংবা ১ বছর পরে, তার মানে এই না যে আমি কোনরকম কমার্শিয়াল জায়গার কথা চিন্তা করে কাজ করবো আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার আশায়। শোনো আমার ছবির টাকা ম্যানেজ করতে গিয়ে আমাকে অনেক টাকা জোগাড় করতে হইছে, নিজের সহায়ও আপসাইড ডাউন অবস্থা। সে যাই হোক, আমাদের যে স্টোরির প্রভোকেশন ছিল, ফর্ম নিয়ে যেরকম গিমিক তৈরী করা যাইতো সেইগুলার দিকে কিন্তু আমরা হাঁটিই নাই। আমরা অনেক টাকা জোগাড় করছি ঠিকই সময়টাকে রিকনস্ট্রাক্ট করার জন্য। কিন্তু আমরা আমাদের রাস্তায় গেছি যে রাস্তা আমাদেরকে নিয়ে গেছে। আমি মনে করি ফিল্মমেকারের মধ্যে এপ্রোচের এক্সিলেন্স থাকতে পারে। অর্থাৎ একটা এপ্রোচ দিয়ে সে গল্পটাকে অনেক হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে পারে, এটা তার একটা ক্রেডিবিলিটি হইতে পারে কিন্তু সে যখনই কোন কমার্শিয়াল এলিমেন্টকে ব্যালেন্স করে তার সিনেমাতে ইন কর্পোরেট করার চেষ্টা করবে এইটা ভিজিবল হবে। কারণ ফিল্ম ইজ আ ভেরি মাচ ভিজিবল মিডিয়াম। দ্যট ইউ ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াটএভার এলিমেন্ট দ্য ফিল্মমেকার হ্যাজ ইউজড ফর সাম পার্টিকুলার পারপাস ইফ ইট ইজ বিন ইউজড এজ এ পারপাস। সেকারণে দুইটা আসলে একসাথে চলতে পারেনা। এর কোন ব্যালেন্সিং মেথড নাই আরকি।

রুদ্র কাওসারঃ স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পর্কে জানতে চাই। চলচ্চিত্র কিভাবে নির্মিত হলে স্বাধীন চলচ্চিত্র বলা যাবে? এক্ষেত্রে আমার মূলত জানার আগ্রহ নির্মাণে সিদ্ধান্ত নিতে ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’ কতটুকু পাওয়া যায়? পাশাপাশি সরকারি অনুদান বা কোন লগ্নিকারী প্রযোজনা সংস্থার বাইরে কোন আগ্রহী প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান গ্রহণ করলে সেটা স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে কতখানি অন্তরায়?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ সিনেমা হিস্ট্রির ট্রেন্ডটা কি? অজুরা তো স্টুডিও বেজড ফিল্মই বানাইছে। ওদের মধ্যে আসলে যথেষ্ট স্বাধীন জায়গা ছিল কি প্রডিউসাররা খুব একটা ইন্টারাপ্ট করেনি তাদেরকে। হয়ত ক্যারেক্টার সিলেকশনে দুই-একটা জায়গায় তারা বলছে যে এই ক্যারেক্টারকে দেখতে পারো এ কেমন হবে। গদারের আনা কারেনিনার সাথে পরিচয়ই হইছে এক প্রডিউসারের মাধ্যমে। তো আমি বলছি যে প্রডিউসাররা অনেক সময় রোল প্লে করে। দে হ্যাভ ডিফারেন্ট রোলস ইন আ সিনেমা। ইভেন হি কুড টেক পার্ট ইনটু ন্যারেটিভ আইডিয়াস। কারণ ফিল্ম তো ইটসেলফ আ কমবাইন্ড মিডিয়াম। সিনেমার গল্প বা স্ক্রিপ্ট লেখার সময়ে আমরা কখনও কো স্ক্রিপ্ট রাইটার নেই। তারপর পাঁচজনের সামনে গল্পটাকে পড়ি। তখন কিন্তু দেখা যায় যে দু-একজনের পয়েন্ট অফ ভিউ মে এট্রাক্ট ইউ। কেন তলস্তয় অন্য মানুষের কাহিনী শুনে গল্প লেখে নাই? ওর যে ‘রেজারেকশন’, সেটা তো এক স্কুল শিক্ষিকা ওর বাসায় বেড়াতে আসলে তার কাছে গল্পটা শুনে আর ঐখান থেকে ১০ বছর ধরে কোর্টে জাজমেন্ট শুনতে বসে থেকে থেকে তারপর কাজটা করে। তো গল্প ঠিক করা, গল্পের সাজেশন নেয়া এইগুলা প্রডিউসারের রোলের মধ্যে পড়ে। সে চাইলেই সাজেশন দিতে পারে। সেইটা তুমি নিবা কিনা, তুমি কতটা ফার্ম তোমার স্টোরি বা আইডিয়ার জায়গাটাতে সেটা আমরা হিস্ট্রিক্যালি বুঝতে পারি। কিভাবে আমাদের ফিল্মমেকারদের জীবনে সিদ্ধান্তগুলাতে কতটা ম্যানিপুলেটেড হইছে, কতটা এক্সেপ্টেবল কন্ডিশন মিউচুয়াল করে আগাইছে আর কতটা ডিনাই করছে সেই জায়গাটা তাদের গ্রেটার স্বার্থকে যদি নষ্ট না করে সেক্ষেত্রে ভাল সাজেশন নেয়াকে আমি কোন দোষের মনে করি না। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতার কন্ডিশন এরকমই অনেকটা। তুমি তো অনেক কিছু জানো না। তুমি তো মিউজিকের অনেক কিছু জানো না যেটা একজন মিউজিশিয়ান জানে, একটা অঞ্চলের সঙ্গীত নিয়ে বা তার হিস্ট্রি নিয়ে। আমি তখন তার মতামতটাকে গ্রহণ করতে পারবো কি পারবো না সেটাই আসলে ব্যাপারটা। তুমি তো অনেক এক্সপেরিমেন্টাল ছবি দেখছো যেগুলার মধ্যে গল্পের কোন আগামাথা নাই, কিন্তু ফর্মের কারণে এই ছবিটা অন্য এক জায়গায় পৌঁছায়। আবার ন্যারেটিভ ফর্ম আরেক রকম জোনাস মেকাস এর কাছে। এইখানে কতটা স্বাধীন জোনাস মেকাস? এখন ব্যাপার হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গির জায়গাটা। একজন ফিল্মমেকারের আসলে পারপাসটা কি ইন দিস পার্টিকুলার ওয়ার্ক? এইটা সে কেন করতে চাচ্ছে? এখানে কি তার আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ঘটবে তার কাজের মধ্য দিয়ে। ক্রিয়েটিভ কাজের আসলে মূলসূত্রই এই জায়গায়। সেইটাতে যদি তুমি কনভিন্সড থাকো যে আই নিড দিস টেল দিস স্টোরি বা আই নিড টু মেক দিস স্ট্যান্ড, সেইখান থেকেই তো একটা জুয়েল আসে। আর তা নাহলে তো তুমি অর্ডারেরি কাজ করতেই পারো, ভাই একটু কমিশন আছে তাই ছবিটা বানায় দিলাম। আমি মনে করি ফিল্ম আর্টের ক্ষেত্রে টাকা জোগান দেওয়া ছাড়া কমার্সের আর কোন সংযুক্ততা নাই। যেভাবে ধরো আর্টওয়ার্ক সেল হয়। ভ্যানগগ না খেয়ে মরছে আর এখন তার আর্টওয়ার্ক সবচেয়ে দামি। একইভাবে সিনেমার ক্ষেত্রেও এটা থাকবে যে ফিল্মমেকার কোত্থেকে টাকা ম্যানেজ করতেছে জানি না কিন্তু সে এই ছবিটাই বানাইছে যেইটা সে বানাইতে চাইছিলো।

রুদ্র কাওসারঃ প্রদর্শন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান সিনেমা হল কাঠামোর ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ ব্যবস্থার মধ্যে চলচ্চিত্র প্রদর্শন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ চর্চায় কতখানি সাংঘর্ষিক? আদর্শিক ভাবেও।

এন রাশেদ চৌধুরীঃ শোনো বাংলাদেশে কিছুই এগজিস্ট করে না। বাংলাদেশে কোন ইনফ্রাস্ট্রাকচাল সিস্টেম নাই। এখানে গভর্নমেন্ট বারবার ঘোষণা দিচ্ছে কিন্তু বিন্দুমাত্র কোন ইউটিলিটি এপ্রোচ নাই। যখন সময় ছিল ফিল্ম ইনস্টিটিউট করার তখন করে নাই। সে কারণে অটোমেটিক্যালি যারা ষাইটের দশকে ওস্তাদের কাছে ছবি শিখছে তারা আশির দশকে আইসা শ্যাষ হইয়া গেছে। আমরা বলি না যে আশির দশকের পর বাংলা সিনেমায় এরকম হয়ে গেল কেন রে ভাই! তো আসলে এইটা কেমনে হবে, কোথা থেকে শিখবে ফিল্মমেকিং? এফডিসির যারা টেকনিশিয়ান, যে কালারিস্ট সে ওস্তাদের কাছ থেকে কালারিং শিখছে তার আর কোন পড়াশোনা নাই। শুধু এইডার লগে এইডা মিশাইলে এইডা হইয়া যাইবো এই হিসাব থেকে সে ফিল্ম প্রসেসিং শিখছে। সুতরাং তার থেকে তুমি আর কী আশা করো? কিংবা ফিল্মমেকাররাও কোত্থেকে শিখবে? এই যে কতগুলা ফিল্মমেকারের সাথে কাজ করছিলো বলে পরের জেনারেশনটা আশির দশক পর্যন্ত চালায় গেছে। তারপরে কোত্থেকে শিখবে সিনেমা বানানো? তো এই ব্যাপারে কোন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সাপোর্ট এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠে নাই। মাত্র পাঁচ বছর হইছে ফিল্ম ইনস্টিটিউট হইছে, আর এখনই তুমি আশা করতেছো ওরা বাইর হইয়াই কন্ট্রিবিউট করবে ন্যাশনাল সিনারিওতে! এইটা একটা দীর্ঘসূত্রিতার বিষয় যা দীর্ঘকাল ধরে ইগনোরড ছিল। তুমি ষাট-সত্তর সালের ধ্রুপদী দেখো, খসরু ভাই এই বিষয় নিয়ে বারবার লিখতেছে। এখনও ফিল্ম ইনস্টিটিউট নিয়ে কেন ভাবতেছে না, আর্কাইভ কেন গঠন করতেছে না! তার চিল্লাচিল্লিতে বিশ বছর পরে আর্কাইভ হইলো। ফিল্ম ইনস্টিটিউট হইলো মাত্র পাঁচ বছর আগে। আর ‘ইন্ড্রাস্ট্রি’ তো আলাদা একটা ইস্যু। ফিল্মমেকারই কই? তারপর ডিস্ট্রিবিউশনটা চলো কেমনে? দেয়ার ইজ আ ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম যেখানে হলগুলা তাদের কব্জায় আছে, এই হল মালিকেরা লেনদেন করে অবৈধভাবে তাদের সাথে। এই অবস্থায় হল ব্যবস্থা ‘টিকে আছে’। আর অন্যান্য দেশে দেখো কী অবস্থা। এখনও আমাদের গভর্নমেন্টের যে পার্টিকুলার মিনিস্ট্রি যারা দেখভাল করে এটার তাদের কমপ্লিট ফেইলিয়র হচ্ছে আজকের এই সিচুয়েশন। তারা যদি নীতি নির্ধারক হিসেবে নিজেদেরকে দাবি করে তাইলে আমি বলবো এটা তাদের ফেইলিয়র। তারা যদি বলে আমাদের নীতি নির্ধারণের কোন দায়িত্ব ছিল না তাইলে আমার কোন কথা নাই। দায়িত্ব তো অবশ্যই ছিল কারণ এফডিসি যদি তারা এস্টাব্লিশড করে থাকে তাহলে বাকি অংশও তাদের এস্টাব্লিশড করার কথা। তো সেইখানে তারা কি করছে? তুমি আজকে যাও তোমার ছবি ডিস্ট্রিবিউট করতে ওরা কি ঘোল খাওয়ায় তোমাকে দেখো। স্বাধীন নির্মাতা তো পরের প্রশ্ন। দুই তিনটা ছবি রিলিজ করতে যাও না। সিনেপ্লেক্সগুলা যদি কাহিনীর কারণে তোমার ছবি নেয়, যেহেতু তাদের অনেক ভেরিয়েশন দরকার হয়, তাইলে একমাত্র তোমার ছবি চলবে। তারপরেও দেখো ‘ন ডরাই’ ছবিটায় কি ঘটলো? বসুন্ধরায় সিনেপ্লেক্সে মুক্তির ব্যবস্থা করলো, সাথে সাথে ডিস্ট্রিবিউশন এসোসিয়েশন থেকে চিঠি ইস্যু করলো যে ‘আপনি আমাদের পারমিশন ছাড়া কেন রিলিজ দিছেন’! কেন আমি তোমার পারমিশন নিবো?

রুদ্র কাওসারঃ বাংলাদেশ সরকারকে তো এখানে শুধু নীরব ভূমিকাই নয় রীতিমত এই সিস্টেমকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা যায়। ভারতে যেখানে ‘ফিল্ম ডিভিশন’ নামে সম্পূর্ণ আলাদা প্রতিষ্ঠান ও ফান্ড গঠন করা হইছে যেখান থেকে প্রতি বছর ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে বের হওয়া স্টুডেন্টদের আর স্বাধীন নির্মাতাদের টাকা দেওয়া হচ্ছে ফিল্ম বানাতে। শিক্ষিত নির্মাতাদের শিল্পমানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণে এই যে ভারতের সরকার সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে, এইসব ফিল্মমেকারদের একের পর এক কাজ করতে দিচ্ছে, যার ফলে একটা সময়ের পর এই ফিল্মগুলা বিশ্বব্যাপী নানা অর্জন নিয়ে আসায় সিনেমায় ভারতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যে উন্নততর হইছে সেইরকম কোন ইনিশিয়েটিভ আমাদের সরকারের কাছে তো দেখা যায় না। আমার তো মনে হয় আসল সমস্যা হলো ব্যক্তি থেকে সরকারি পর্যায়ে সবখানে সিনেমাকে ‘ইন্ডাস্ট্রি’ রূপে চিন্তা করা, ‘ইন্ডাস্ট্রি’ শব্দের সাথে অতি আলোচনা করা। আপনার কি মনে হয়?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ আমার তো কোন আপত্তি নাই যদি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এগজিস্ট করে। কারণ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এগজিস্ট করলে এর ইনফ্রাস্ট্রাকচার থাকবে, এই ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সুবাদে আমার তোমার মতো যে ফিল্মমেকার আছে তাদের ফিল্মগুলাও হয়ত দুই তিনটা হলে চললেও চলতে পারে। দিস ইজ দ্য অনলি পসিবিলিটি ফর আস টু থিংক এবাউট দিস মেইনস্ট্রিম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু আমরা তো এখন কোন জায়গাতেই নাই।

রুদ্র কাওসারঃ সেন্সর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কি বলবেন? সেন্সর করাতে গেলে এই যে বারবার শুনতে পাই ডিরেক্টলি বা আনঅফিসিয়ালি বলছে পরিচালক সমিতির বা প্রযোজনা সমিতির ছাড়পত্র লাগবে, যার জন্য আবার তাদের সদস্যপদ লাগে বেশ অংকের টাকার বিনিময়ে।

এন রাশেদ চৌধুরীঃ এইটা তো একটা স্টুপিডিটি আমি মনে করি। কিসের প্রযোজক সমিতি! একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারের নিজের যে প্রিপারেশন সেইটার স্টেজ আজ পর্যন্ত দিতে পারে নাই। আবু সাইয়ীদের মত ফিল্মমেকাররা স্টেটের সাপোর্টের বাইরে থেকে কোন ফিল্ম স্কুল থেকে না পড়েও নিজের পড়াশোনায় ফিল্ম বানাইছে নানা কষ্টে হইলেও। আমি একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট হইয়া কেন প্রযোজক সমিতির ছাড়পত্র নিবো? এইটা তো তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটা জারি করা আদেশ। এবং এইটা এফডিসির একটা নিয়ম যে তুমি যেকোন ছবি বানাইতে গেলে আগে তুমি তাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিবা। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোন সুবিধা তো পাবাই না, ক্যামেরা শিডিউল পাবা না, টাকা দিয়ে ভাড়া করতে গেলেও শিডিউল দিবে না তোমারে। আবার বলতেছে ছাড়পত্র নিতে! কার কাছ থেকে ছাড়পত্র নিবা? যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের আমি আমার সিনেমায় যে ফর্ম ব্যবহার করতেছি তার সম্পর্কে যাদের কোন ধারণাই নাই তার কাছে আমাকে ইন্টারভিউ দিতে হচ্ছে। অথচ তাদের ওয়ার্ল্ড সিনেমা, সিনেমা ফর্ম নিয়ে কোন পঠন-পাঠনই গড়ে ওঠে নাই এমন মানুষরা আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছে। আমার এরকম দেখা আছে যে অনুদানের ছবি করতে গেলে ছাড়পত্র নিতে হবে, পঁচাত্তর হাজার টাকা দিয়া এফডিসির মেম্বার হইতে হবে। অঞ্জনদা এইটার মেম্বার হয় নাই তার ফিল্মের সময়। আমরা বিষয়টাকে ম্যানেজ করছি আইনের মাধ্যমে। তাছাড়া শর্ট ফিল্ম ফোরামের থেকেও একটা উদ্যোগ নেয়া হইছে যে শর্ট ফিল্ম ফোরামের একটা ক্ষমতা থাকতে পারে। অনুদান প্রক্রিয়াটাতে আমাদের একজন রিপ্রেসেন্টেটিভ থাকবে বিচারক হিসেবে এবং আমরা এইটার ইনিশিয়েটর। উই উইল প্রপোজ টু দ্য গভর্নমেন্ট এন্ড উই মেড দ্য গভর্নমেন্ট বাউন্ড টু গিভ অনুদান ফর শর্ট ফিল্মস। এইটা আমাদের ফেস্টিভ্যালে তাকে আইনা লিখিত বক্তব্য পাঠ কইরা তাকে দিয়া মুখ দিয়া বাইর করায়া নেওয়া হইছে, তারপর ঐ অনুযায়ী প্রপোজাল দিয়া এইটা মিনিস্ট্রি থেকে পাশ করানো হইছে। এই পুরা প্রক্রিয়াটা আমি এবং আমার কয়েকজন কলিগ শর্ট ফিল্ম ফোরাম থেকে করছি। যে শর্ট ফিল্ম বানাইছে, বা ফিল্মে স্টাডি করতেছে বা এসিস্ট করছে, কোন না কোন প্রোডাকশনে সংশ্লিষ্ট এমন যে কেউ ফোরামে মেম্বার হইতে পারে, এবং মেম্বার হিসেবে সে ফোরামের ছাড়পত্র নিতে পারে। আমরা বলবো যে এই ফিল্মমেকারকে আমরা চিনি, সে ফিল্মে আগ্রহী, সে ছবি বানাইতে ইচ্ছুক। এই জিনিসটা আমি এফডিসি থেকে কেন নিব? আমি কি ওখান থেকে কোন সুবিধা পাই?

রুদ্র কাওসারঃ আর সুবিধা পাওয়া না পাওয়ারও কথা না। আমি যদি চাই যে একেকবারে আমি নিজের ফিল্ম নিজ উদ্যোগে বানাবো, এমনকি আমি একাই বানাবো। সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, সাউন্ড, অন্যান্য টেকনিক্যাল দিক, অর্থায়ন সবকিছু আমিই করবো, কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে এক দুইজনকে নিয়ে নিব – এভাবে একজন স্বাধীন নির্মাতা ফিল্মটা বানাইতে চাইলে আমাদের বর্তমান সিস্টেম তো তার জন্য বাধা। ফলে এই দেশে স্বাধীন নির্মাণই কিভাবে হবে, চলচ্চিত্রই স্বাধীন কিভাবে হবে, আর বাংলাদেশ আদৌ কোনদিন চলচ্চিত্রে কিভাবে অবদান রাখবে সে যদি শিল্পীকে স্বাধীনতা না দিতে পারে?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ শোনো যে দেশের গভর্নমেন্ট ফিল্ম ইনস্টিটিউট, আর্কাইভ করতেই এতদিন সময় লাগাইছে, এখনও যার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ঠিক হয় নাই, সেই দেশে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকিং যে আলাদা গুরুত্ব পাবে এইটা তুমি ভাবোই কিভাবে! ইন্ডিয়াতে কি হইছে? তুমি যেইটা বললা- ফিল্ম ডিভিশন। এই এফডি বা এনএফডিসি, এরা প্রচুর ছবি প্রডিউস করছে। যার কারণে ইন্ডিয়াতে আর্ট সিনেমা টিকে আছে। ইন্ডিয়ান সিনেমা ইজ এগজিস্টিং বিকজ গভর্নমেন্ট ইজ প্রডিউসিং ইন দিজ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মস। তুমি পাঁচজন ফিল্মমেকার দেখো তাদের মেক্সিমাম ছবি ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্টের প্রডিউস করা।

রুদ্র কাওসারঃ হ্যা, ফলে ইন্ডিয়ান সিনেমা ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরী হইছে ওয়ার্ল্ড সিনেমা হিস্ট্রিতে। এবং এমনকি এই যে ইন্ডাস্ট্রির দিকেই তাদের সকল আগ্রহ, অথচ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রিতে তাকালেই দেখা যাচ্ছে সবখানে কমার্শিয়াল সিনেমা সেখানকার ডেভেলপিং আর্ট ফিল্ম থেকে গ্রহণ করছে। এবং ইন্ডাস্ট্রির ফিল্মও নতুনত্ব আর ভেরিয়েশন দিতে পারছে। ইন্ডিয়াতেই যদি তাকাই তাই দেখবো।

এন রাশেদ চৌধুরীঃ এইখানে আমাদের দেশ ভাবে সবই করতেছে, কিন্তু কিছুই করতে পারতেছে না। পাঁচটা করে অনুদান দিতেছে, এখন নাকি দশটা কইরা দিবো। বছরে ১২-১৩টা ছবি গভর্নমেন্ট প্রডিউস করে। কিন্তু তাদের মনিটরিং এজেন্সি কোথায়? এই ছবিগুলাতে কি হইতেছে? আমার ছবিটা সেন্সর আটকায় দিছে। কুড ইউ বিলিভ ইট? আমার ছবিটা অনুদান পাওয়া, সেখানে পাঁচটা ধাপে স্ক্রিপ্ট পাশ করাইতে হইছে। প্রথমে স্ক্রিপ্ট জমা দিয়ে এপ্রুভ হওয়া, পরে ৩ জনের কমিটিতে স্ক্রিপ্ট পাশ করানো, তারপরে ফাইনাল স্ক্রিপ্ট সাবমিট করা, সেই স্ক্রিপ্ট দিয়ে শ্যুটিং করার পর ৩ ধাপে রাশ এপ্রুভ করানো, তারপর ফাইনাল স্ট্রাকচার এপ্রুভ করানো ইনক্লুডিং সাউন্ড এন্ড মিউজিক, এন্ড ডায়লগস অল টু বি ডাবড। সেই ফাইনাল স্ট্রাকচার আমি পোস্ট করে আসার পরে আমার ছবি সেন্সরে আটকাইছে ঐ একই মিনিস্ট্রি, একই কমিটি। তাদের অজুহাত আমার ছবির স্ট্রাকচার ঠিক নাই। আরে ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফর্ম নিয়ে, আর্ট হিস্ট্রি নিয়ে আপনার কী ধারণা আছে? আমি কোন স্ট্রাকচার ফলো করি নাই, দ্যট ইজ মাই স্ট্রাকচার। তুমি তো কোন লেখককে গিয়ে বলতে পারবা না আপনি এইভাবে বইটা লিখছেন কেন, এইভাবে লিখলে ভাল করতেন। আমি হাজারটা ছবির উদাহরণ দিতে পারি যেইটা দেখলে তুমি স্ট্রাকচারই বুঝবা না। তাইলে ভাই স্ট্রাকচার নিয়ে তুমি কথা বলবা কেন? তুমি কথা বলবা শুধু যে বিষয়ে তোমার নলেজ আছে একর্ডিং টু দ্য হোল ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অফ সিনেমা। তারপরে অজুহাত কি? আপনার ছবিতে ভাষাভঙ্গি ঠিক নাই। আমি কিশোরগঞ্জের স্থানীয় এক পালাকার শিল্পীকে যুক্ত করছি ল্যাঙ্গুয়েজ এডিটর হিসেবে যে ১৪ পুরুষ ধরে ঐ এলাকায় থেকে ঐ ভাষায় কথা বলে আসতেছে। আমরা ভাষায় কাব্যিকতাও ব্যবহার করছি, পোয়েটিক ফর্মে ভাষা যেভাবে আবর্তিত হয়। বলছে যে- আপনার আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার সঠিক হয়েছে কিনা এই বিষয়ে সন্দেহ আছে। এই ধরনের উদ্ভট ২-৩টা ক্লজ নিয়া তারা আমার ছবি আটকায় দিছে সেন্সরে। আই গিভ শীট টু দিস সেন্সর বোর্ড। আই উইল নেভার কাট এনিথিং এজ আ ফিল্মমেকার। আমি তো একটা কথাও ফেলবো না। আমি কি ১৫ লাখ টাকা খরচ করে আবার পোস্ট করে আসবো নাকি! ইভেন দে হ্যাভ নো আইডিয়া ইন পোস্ট এন্ড ফিল্মমেকিং দোজ হু আর সিটিং ইন ডিসিশন মেকিং। আমাকে বলে আপনার ছবি তো কিছুই হয় নাই, এই ছবি বানাইতে তো ১০ লাখ টাকাও লাগার কথা না। আর আমি তাদেরকে এফডিসির ক্যামেরা ভাড়া বিল দিছি ১৫ লাখ টাকা। যে এই কথা বলতে পারে সে তো প্রি হিস্টেরিক লুক দেইখাও ধারণা করতে পারে এইটার পিছনে কত খরচ হইছে। সে যদি না বুঝে এই ধরনের হিস্ট্রিক্যাল টাইম তৈরী করে ৩৩ দিন শ্যুট করতে কত টাকা লাগে তাদের কাছে তুমি সিনেমার কী ডেভেলপমেন্ট আশা করো? এফডিসিতে কীসব ছবি সেন্সর পাইছে ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে না? আমার কথা কিন্তু এইগুলা রাগের না, যুক্তির। তোমার যদি এনাফ লিটারেরি সেন্স না থাকে তাইলে তুমি ফিল্মের ডিসিশন কেমনে দিবা? এইটা তো একটা আর্ট ফর্ম।

রুদ্র কাওসারঃ তাহলে আপনার প্ল্যান কি? ‘চন্দ্রাবতী কথা’ আমরা দেখবো কিভাবে? কিভাবে প্রদর্শনে আসবে? আপনার কি কোন বিকল্প ভাবনা আছে?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ কি করবো জানিনা। সেন্সর দিলে দেখাবো আরকি। সিনেপ্লেক্সগুলা আর ২-৩টা হলে। ইন্ডিয়াতে যে কয়টা শো হইছে আমি দেখলাম যে প্রচুর সাড়া পাইছে। বাহিরেও দেখানো হইছে। কয়েকটা ফেস্টিভ্যালেও গেছে। এখন আমাদের গল্পটা আমরা ডিল করছি একটা প্রি হিস্টোরিক লিটারেরি ট্রেন্ড নিয়া যে হিস্ট্রির পড়াশোনা না থাকলে দর্শক এটা ধরতে পারবে না। কেন একটা লোক হঠাত এইখানে এসে দাঁড়ায়ে কথা বলতেছে, এরা কারা, কী চরিত্র এইগুলা কিছুই বুঝবে না। তুমি যদি আন্দ্রে রুবলেভের গল্প না জানো তুমি তো ‘আন্দ্রে রুবলেভ’ বুঝবা না। ইউ হ্যাভ টু স্টাডি এবাউট দ্য ব্যাকগ্রাউন্ড অব দ্য স্টোরি। ‘পথের পাচালি’ দেখার সময় আমি যদি মনে না করি এটা ’৪৩ এর মনন্বতরের পরের গল্প, ঐ সময়ে দুর্ভিক্ষ হয়ে যাওয়ার পরপরের ঘটনা, যেটা ছবিতে সরাসরি কখনই দেখানো হয় নাই, সেটা না জানলে কিভাবে আমি ঐ কন্ডিশনকে বুঝতে পারবো? ওয়েস্টার্ন অডিয়েন্সের কাছে ঋত্বিকের ‘তিতাস’ যেমন দুর্বোধ্য তুমি এই দেশের মানুষ হইলেও নলেজ না থাকলে তো তোমারও তেমনই হবে। কুমার সাহানি বললো- প্যারিসে যখন অবশেষে দেখাইতে সক্ষম হইলেন ‘তিতাস’ তখন ঐখানে ৩ জন অডিয়েন্স ছিল, তার মধ্যে ২ জনই ১০ মিনিট পরে উইঠা গেছে, আর ছিলাম আমি একা বইসা। ঐটা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই যে ছবি কে দেখলো কে দেখলো না। এখন তো মিডিয়াম হিসেবে অল্টারনেটিভ প্ল্যাটফর্মগুলাকেও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। এটারও গুরুত্ব আছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও দিবো আমরা ছবিটা। আর দেখি কোথায় কী করা যায়?

রুদ্র কাওসারঃ আচ্ছা। ফোরাম সম্পর্কে জানতে চাই। অতীতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম মুভমেন্টে শর্ট ফিল্ম ফোরামের যে প্রত্যক্ষ ভূমিকা দেখা গেছিলো এখন নতুন ভাষার নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণে ফোরামকে নতুন কিছু করতে দেখা যায় না কেন? ফোরামের বর্তমান পরিকল্পনা কি?

এন রাশেদ চৌধুরীঃ আমি একটা কথা বলি। প্রথমে এইটা নিয়ে একটা ভ্রান্ত ধারনা সবার হয় যে ফোরাম কি সংগঠন যে তারা সময়ের সাথে সাথে ফিল্মমেকারদের একমোডেট করতে পারে নাই! এইটা মোরশেদুল ইসলামও এক জায়গায় বলছে দেখলাম যে- ফোরাম আসলে ওরকম কোন সংগঠন না যেটা ছবি দেখানো বা ফিল্মমেকার খুঁজে বাইর করা বা ফিল্মমেকারদের কানেক্ট করার দায়ভার আছে। সেইটা স্বাভাবিকভাবে অবশ্যই যতটুকু করা যায়। তুমি খেয়াল করলেই দেখবা ফোরামটা গঠিতই হইছিলো এজ আ প্ল্যাটফর্ম অর্গানাইজেশন। যারা তখন ফিল্ম বানাবে বলে ভাবছিলো এবং সেখানে তারা ‘আগামী’, ‘হুলিয়া’ বানানোর মাধ্যমে একটা মুভমেন্ট শুরু করলো। ‘আগামী’ আর ‘সূচনা’ দুইটাই সেন্সরবোর্ড আটকায় দিছিলো, তাই ফিল্মমেকাররা একটা প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই ১৫-২০ জন ফিল্মমেকার নিজেরা যখন ছবি বানাবে তার জন্য। ইট ওয়াজ আ প্ল্যাফর্ম অফ ফিল্মমেকার্স এন্ড ফিল্ম ক্রুজ। পরবর্তীকালে যেটা হইলো যারা ফিল্মমেকিং প্র্যাক্টিসটাকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেভেলে রাখতে পারলো তারা কিন্তু ফোরামের সাথে ছিলই এবং এখনও আছে। কিন্তু যারা ধরো মনে করছে যে এখানে আমার বিশেষ কিছু করার নাই তারা ছেড়ে দিছে। আবার তানভীর ভাই মোরশেদ ভাইদের ফোরাম নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে, কিন্তু ফোরামের কোন প্রোগ্রাম থাকলে যত ব্যস্ততাই থাকুক আসার চেষ্টা করে, এটার সাথে সংযুক্ত আছে এখনও। এইটা তো একটা রিজিড অর্গানাইজেশন আমি বলবো। রিজিড ইন আ সেন্স, যে এটার মেম্বার হবে সে তার দাবিদাওয়া নিয়ে আসতে পারে অন্যান্য মেম্বারদের সামনে যে ভাই আমার ছবিটা আটকাইছে আপনারা কিছু করেন। ফোরাম যদি মনে করে ইট হ্যাজ আ সেইম আইডিওলজি তখন কিন্তু ফোরাম এইটার পক্ষে দাঁড়াবে, প্রটেস্ট করবে। ছবি নিয়ে লেখার কালচার করতে পারি। এইসব জায়গা থেকে ফোরাম এখনও এক্টিভ ইন দ্য সেন্স। কিন্তু আসলে ঐ ফিল্মমেকার গ্রুপটাই তো নাই। ছবি নিয়ে লেখার কালচার করতে পারি। আমি, আকরাম পর্যন্ত একটা ফেজ যাওয়ার পরে ভিডিও আসলো। বিষয়টা অনেক পারসোনাল লেভেলে চলে গেল। পারসোনাল লেভেলে গিয়ে ফিল্মমেকাররা তাদের ছবি বানানো এবং দেখানো যতটুকু লিমিটেড জায়গার মধ্যে সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অল্প কিছু দারুণ কাজ ছাড়া গত ১০-১৫ বছরে এটার খুব বেশি চর্চা হয় নাই। এখন আবার হচ্ছে। তোমাদের মতো তরুণ নির্মাতা অনেকেই কাজ করতেছে...

রুদ্র কাওসারঃ আমি আসলে প্রশ্নটা করেছিলাম যে আলাপের আশা করে, ফোরামকে সম্প্রতি যে কাজ করতে দেখছি তরুণদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করতে সে ব্যাপারে। এটা তো দারুণ একটা উদ্যোগ যেভাবে তরুণ এবং স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের ফিল্মগুলা এক জায়গায় দেখার ও দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে। এই বিকল্প প্রদর্শন ব্যবস্থার চর্চা, যা কিনা বড় আকারেও করা যেতে পারে সে বিষয়ে...

এন রাশেদ চৌধুরীঃ শোনো আমরা যতদিন ফোরামে এক্টিভ এ লট অফ ইয়াং ফিল্মমেকার্স কাম এন্ড ডিসকাস এবাউট পসিবিলিটিজ ইন সিনেমা হেয়ার। আই পারসোনালি ওয়াজ ভেরি মাচ কানেক্টেড টু দিজ ইয়াং গ্রুপ অফ পিপল অলওয়েজ। এই ইনিশিয়েটিভটা রকিব নিছে। রকিব ইজ দ্য প্রেজেন্ট জেনারেল সেক্রেটারি। এইটা ওরই আইডিয়া। এখন এইখানে অনেক ফিল্মমেকারকে একমোডেট করতে হইছে, অনেক ভাল ফিল্মমেকার বাদও পড়ে গেছে। আমরা সবাই যেহেতু হোল হার্টেডলি এখানে পার্টিসিপেট করতে পারি নাই। একটা প্রোগ্রাম হইলে ঐটার একটা পার্টিকুলার সিলেকশন কমিটি থাকে। ধরো এই ছবিগুলা ৩-৫ জন দেখে। সেখান থেকে সিলেকশন হয়। রকিব এইটার কোঅর্ডিনেট করে। এরকম অনেক ছোট ছোট জটিলতা থাকে। এন্ড ইউ গাইজ ইফ ইউ জয়েন হু আর ইন দ্য প্র্যাক্টিক্যাল ফিল্মমেকিং ফিল্ড ইট উইল বি মোর অর্গানাইজড আই থিংক। তারপরেও আমি মনে করি দিস ইজ আ ভেরি গুড ইনিশিয়েটিভ। উই হ্যাভ এ প্রজেকশন রুম। আমরা দুইটা দিনও ঠিক কইরা দিতে পারি যে দিজ টু ডেজ ইজ ডেডিকেটেড ফর নিউ ফিল্মমেকার্স। এইরকম একটা প্রোগ্রামের দিকেই যাব আমরা ভাবতেছি। ইয়াং ফিল্মমেকাররা আসবে, ফোরামকে বলবে আমাদের ফিল্ম দেখাইতে চাই, ফোরাম ব্যবস্থা করবে। এখান থেকে একটা পত্রিকা বের হবে, সেখানে লিখবে সবাই।

রুদ্র কাওসারঃ অনেক ধন্যবাদ। আপনার জন্য শুভকামনা রইলো।


Download PDF File of this Article